Monday 13 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সাত বছর পর প্রত্যাবর্তন করেই বক্স অফিস তোলপাড় স্টিফেন চাউয়ের

এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্ক
১৩ জুলাই ২০২৬ ১৬:৪৯

বিনোদন জগতের অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নির্মাতা স্টিফেন চাউ দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় পর আবারও পরিচালকের আসনে ফিরে এসে চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। ২০২৬ সালের এই গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে বিশ্বজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পেয়েছে তার বহুল প্রতীক্ষিত এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র ‘কুং ফু সকার’। দীর্ঘ বহু বছরের সুনিপুণ প্রস্তুতি এবং প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিশাল বাজেটের এই প্রকল্পটি মুক্তির মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই চীনা বক্স অফিসে এক অভাবনীয় ঝড় তুলেছে। মুক্তির প্রথম কয়েক দিনেই চলচ্চিত্রটি প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার আয় করে দ্রুততম সময়ে আয়ের শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে এবং ইতিমধ্যেই প্রায় ৫৮ লক্ষাধিক দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। গত তিন বছরের মধ্যে সমগ্র চীনা চলচ্চিত্র বাজারে যেকোনো সিনেমার জন্য এটিকে সবচেয়ে সফল এবং ঐতিহাসিক একটি গ্রীষ্মকালীন অভিষেক বা ওপেনিং হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ছবির মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে এমি নামের একটি নারী ফুটবল দলকে কেন্দ্র করে, যারা সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা অত্যন্ত সাধারণ কিছু মেয়ে হলেও প্রত্যেকেই মার্শাল আর্টে অসাধারণ পারদর্শী। তারা মূলত তাদের কুংফু শৈলী এবং ফুটবলের অনন্য সমন্বয় ঘটিয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে জয়লাভ করে এবং এর মাধ্যমে প্রায় ২০ বছর আগের বিখ্যাত ‘শাওলিন সকার’ চলচ্চিত্রের সেই চিরচেনা হাস্যরস, নিখাদ বিনোদন, মার্শাল আর্ট ও খেলাধুলার চিরন্তন চেতনাকে নতুনভাবে পর্দায় ফিরিয়ে এনেছে।

বিজ্ঞাপন

বক্স অফিসে এমন চোখ ধাঁধানো এবং চিত্তাকর্ষক ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রটির সামগ্রিক গুণগত মান ও নির্মাণশৈলী নিয়ে দর্শক এবং সমালোচকদের মধ্যে তীব্র মতভেদ ও এক বিরাট বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন চলচ্চিত্র ফোরাম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এই ছবিটিকে কেন্দ্র করে একেবারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদল দর্শক ও চলচ্চিত্র সমালোচক মনে করছেন যে পরিচালক স্টিফেন চাউ তার সেই চিরচেনা ও বিখ্যাত অ্যাবসার্ড কমেডি শৈলীটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ধরে রেখেছেন। তার চেনা ধাঁচের অতিরঞ্জিত হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতিগুলো যেমন দর্শকদের হাসির খোরাক জোগাচ্ছে, তেমনি জীবনের কঠিনতম সংগ্রাম, অদম্য আত্মবিশ্বাস এবং সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করার এক গভীর মানবিক বার্তাও প্রদান করছে। বহু দর্শক তো এই চলচ্চিত্রটিকে ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটি চমৎকার আধুনিক রূপকথা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা বর্তমানের তীব্র মানসিক চাপে থাকা নাগরিক সমাজের মাঝে এক টুকরো আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ফুটিয়ে তোলে। তবে এর ঠিক বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সমালোচকদের মতে, স্টিফেন চাউয়ের মতো একজন বিশ্বমানের কিংবদন্তি পরিচালকের কাছ থেকে দর্শকদের যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ছিল, এই ছবি সেটি পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ছবির মূল গল্পটিকে অত্যন্ত সরল, সাধারণ ও চমকহীন বলে সমালোচনা করা হয়েছে এবং এর স্পেশাল এফেক্টস বা ভিএফএক্স এর মানও এত বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের তুলনায় মোটেও সন্তোষজনক হয়নি। এমনকি চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে জনপ্রিয় মন্তব্য ছিল যে ছবিটি মোটেও খারাপ নয়, তবে কারও প্রত্যাশা যদি খুব বেশি থাকে তবে এটি তাকে চরমভাবে হতাশ করবে। চীনের অত্যন্ত বিখ্যাত উপস্থাপক বা এমসি লিন হাই অত্যন্ত অকপটে এবং সরাসরি এই ছবির সমালোচনা করে মন্তব্য করেছেন যে স্টিফেন চাউয়ের কাছে দর্শকদের আর কোনো ঋণ নেই এবং এই সিনেমাটি একেবারেই জঘন্য হয়েছে। মূলত বছরের পর বছর ধরে দর্শকরা পাইরেটেড কপির মাধ্যমে তার অতীতের ক্লাসিক সিনেমাগুলো বিনামূল্যে দেখার কারণে ভক্তদের মনে যে ‘স্টিফেন চাউকে একটি হলের টিকিট ফিরিয়ে দেওয়ার’ এক ধরণের আবেগঘন দায়বদ্ধতা কাজ করত, এই মন্তব্যের মাধ্যমে সেটিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এই ছবির অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা এবং একই সাথে বিতর্কের পেছনে এর পেছনে করা বিপুল পরিমাণ আর্থিক বিনিয়োগও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চীনা গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে এই চলচ্চিত্রের মোট বাজেট ছিল ৫৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি এবং এর মূল অর্থায়ন করেছিল প্রধান তিনটি বড় কোম্পানি, যার মধ্যে স্টিফেন চাউয়ের নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছিল অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগকারী। এই বিশাল বাজেটের প্রায় অর্ধেক অংশই ব্যয় করা হয়েছে নিখুঁত প্রযোজনা ও বিশেষ ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের পেছনে, প্রায় ১৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে বিশাল সব সেট ডিজাইনে এবং সিনেমার মূল তারকাদের পারিশ্রমিকের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের মাত্র ১৫ শতাংশের মতো। অত্যন্ত রোমাঞ্চকর তথ্য হলো এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দৃশ্যটি ছিল একটি ফুটবল পাস দেওয়ার দৃশ্য, যা রূপালি পর্দায় মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য স্থায়ী হলেও এর জটিল স্পেশাল ইফেক্টস সম্পন্ন করতে দীর্ঘ ৯ মাস সময় লেগেছিল এবং শুধুমাত্র এই একটি দৃশ্য নির্মাণ করতেই খরচ হয়েছে প্রায় ২০ মিলিয়ন আরএমবি। চলচ্চিত্রটির প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন শিনজিয়াংয়ের অপরূপ সুন্দরী ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী দিলরাবা দিলমুরাত, যাকে এই চলচ্চিত্রে স্টিফেন চাউয়ের এক নতুন অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলচ্চিত্রটির প্রচারণার সময় দিলরাবা দিলমুরাতের শারীরিক প্রস্তুতি নিয়ে চারদিকে এই গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে চরিত্রের প্রয়োজনে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ৪ কেজি ওজন বাড়িয়েছেন এবং তার গোড়ালি ফুলে গেছে। তবে এক ফ্যান মিটিংয়ে এই সুন্দরী অভিনেত্রী নিজেই সেই সমস্ত তথ্য সম্পূর্ণ অসত্য বলে নাকচ করে দেন এবং জানান যে তিনি কেবল পেশী শক্তি বৃদ্ধি, শারীরিক সক্ষমতা ও গতিশীলতা উন্নত করতে অত্যন্ত কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, যাতে সিনেমার পর্দায় মার্শাল আর্ট এবং ফুটবলের নানা জটিল ও দুর্ধর্ষ কৌশলের দৃশ্যগুলো বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। পরিচালক স্টিফেন চাউ নিজেও এই অভিনেত্রীর চরম পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা এবং মাসব্যাপী কঠোর পরিশ্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। দিলরাবা দিলমুরাত ছাড়াও এই চলচ্চিত্রে প্রধান পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তারকা অভিনেতা ঝাং ইক্সিং এবং ফুটবল ম্যাচের দৃশ্যগুলোর বাস্তবতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে সত্যিকারের পেশাদার মহিলা ফুটবল খেলোয়াড়দেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি অতিথি শিল্পী হিসেবে কারিনা লাউ এবং জাপানি অভিনেতা সাতো তাকেরুর মতো একঝাঁক বিখ্যাত আন্তর্জাতিক তারকারা এই সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন।

সমালোচকদের এমন তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মাঝে পরিচালক স্টিফেন চাউ দর্শকদের সাথে সরাসরি একটি প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত হয়ে নিজের অত্যন্ত আন্তরিক ও আবেগঘন অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে ৬৩ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি পরিচালক অত্যন্ত সততার সাথে স্বীকার করেছেন যে ছবিটির মুক্তির আগে তিনি ভীষণ রকম মানসিক দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন, কারণ তার ভয় ছিল যে তিনি হয়তো তার অগণিত ভক্তদের সেই আকাশচুম্বী উচ্চ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন না। তিনি প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে প্রেক্ষাগৃহে আসার জন্য সমস্ত দর্শকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে চলচ্চিত্রটি আগামী দিনগুলোতেও দর্শকদের ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়ে এগিয়ে যাবে। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, স্টিফেন চাউয়ের গৌরবময় দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এই চলচ্চিত্রটি ছিল মূলত একটি বিরাট ‘জুয়া’ খেলার মতো। কারণ ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার ‘দ্য মারমেইড’ সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করে অভাবনীয় রেকর্ড গড়েছিল, কিন্তু এরপর থেকে তিনি আর আগের মতো বক্স অফিসে সেই চেনা জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারছিলেন না। তার পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘নিউ কিং অফ কমেডি’ মাত্র ৬০০ মিলিয়ন আরএমবি আয় করতে সক্ষম হয়েছিল। গত বছর স্টিফেন চাউ-এর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বিখ্যাত পরিচালক ওয়াং জিং প্রকাশ করেছিলেন যে সাম্প্রতিক প্রজেক্টগুলো আশানুরূপ ব্যবসা করতে না পারায় স্টিফেন চাউ প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন এবং তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য শীঘ্রই আরেকটি অনবদ্য সৃষ্টি উপহার দেবেন। সামগ্রিকভাবে ১৯৯০-এর দশকে ‘গড অফ গ্যাম্বলার্স’, ‘ফাইট ব্যাক টু স্কুল’, ‘দ্য লেজেন্ড অফ দ্য কন্ডর হিরোস’, ‘এ চাইনিজ ওডিসি’, ‘শাওলিন সকার’ এবং পূর্ববর্তী ‘কুং ফু হাসল’-এর মতো একের পর এক অবিস্মরণীয় ক্লাসিক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে খ্যাতির চরম শিখরে পৌঁছানো এই মানুষটির গভীর মানবতাবাদী দর্শন এবং অনন্য কমেডি শৈলী তাকে এশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অমর ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর