রাজশাহী: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ভাড়া প্রথম ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে কিলোমিটারপ্রতি ৩৫ টাকা। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে কিলোমিটারপ্রতি ৩০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা আছে। কিন্ত, অধিকাংশ চালক ও সিন্ডিকেট এটা মানছে না। বরং, তারা দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেশি ভাড়া আদায় করছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সেবার নামে এরকম শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে রোগী ও মৃত ব্যক্তির স্বজনদের জিম্মি করে চালাচ্ছে মরদেহ নিয়ে ব্যবসা। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদ রয়েছে বলে এই সিন্ডিকেট ধরাছোঁয়ার বাইরে- এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাত্র ৮ থেকে ১০ জন ব্যক্তি পুরো রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে একজনের একক নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে ১১টি অ্যাম্বুলেন্স। এই গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল চত্বর ও আশপাশের এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে চলেছে। তাদের অনুমতি ছাড়া বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স সহজে হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। এমনকি রোগীর স্বজনরা বাইরে থেকে পরিচিত বা কম ভাড়ার অ্যাম্বুলেন্স আনতে চাইলেও নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। ফলে শোকাহত পরিবারগুলো একপ্রকার বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসপাতালে কোনো রোগীর মৃত্যু ঘটলেই দালাল, ওয়ার্ড বয় কিংবা সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে দ্রুত খবর পৌঁছে যায় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছে। এর পর তারা মৃত ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত গাড়ি ব্যবহারে চাপ সৃষ্টি করেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বজনদের অভিযোগ, তারা পছন্দমতো অ্যাম্বুলেন্স বেছে নেওয়ার সুযোগ পান না। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করেন এবং তা দিতে বাধ্য করেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ দিনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অর্ধ-সহস্রাধিক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মরদেহ পরিবহণের সঙ্গে জড়িত রয়েছে অর্ধশতাধিক লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। অভিযোগ রয়েছে, এসব অ্যাম্বুলেন্স থেকে নিয়মিত কমিশন আদায় করে একটি প্রভাবশালী চক্র।
তবে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের অভিযুক্ত এক ব্যক্তির দাবি, তাদের অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া স্বাভাবিক রয়েছে এবং রোগী পরিবহণের জন্য কোনো নির্ধারিত ভাড়া নেই। তিনি বলেন, ‘যে যেমন পারে, সে তেমন করে ভাড়া নিয়ে চলে যাবে। এখানে সিন্ডিকেট বলতে কিছু নেই।’
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন সিন্ডিকেটের আরেক সদস্যও। তার ভাষ্য, ‘ভাড়া পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হয় এবং কাউকে জোর করে অর্থ আদায় করা হয় না।’ রোগীদের গাড়ি প্রয়োজন কিনা, তা জানতে মাঝেমধ্যে ডাকাডাকি করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে এক রোগীর স্বজন বলেন, তার অসুস্থ বাবাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে রাজশাহী মেডিকেলে এনেছিলেন। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বাবা মারা গেলে যে অ্যাম্বুলেন্সে করে এসেছিলেন, সেই একই গাড়িতে মরদেহ নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। বরং স্থানীয় সিন্ডিকেটের অনুমতি ছাড়া মরদেহ বহন সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করলেই কেবল মরদেহ নিয়ে যাওয়া যাবে—এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহ পরিবহণের জন্য কোনো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স নেই। এই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, শুধু হাসপাতাল থেকে মরদেহ পরিবহণেই ক্ষেত্রেই নয়, বাইরে থেকে কোনো লাশবাহী গাড়ি এলে সেখান থেকেও বিভিন্নভাবে চাঁদা আদায় করা হয়। ফলে মৃত ব্যক্তির স্বজনরা চরম ভোগান্তির শিকার হন।
শিবগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন আশরাফ সারাবংলাকে জানান, প্রায় এক মাস আগে তার এক ভাতিজা রামেক হাসপাতালে মারা যান। মরদেহ শিবগঞ্জে নিয়ে যেতে হাসপাতাল এলাকার এক অ্যাম্বুলেন্সচালক ২০ হাজার টাকা ভাড়া দাবি করেন। পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে ১৩ হাজার টাকায় ভাড়া নির্ধারণ করে মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হয়। তার মতে, সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
এমন অভিযোগ শুধু আশরাফের নয়, বহু রোগী ও মৃত ব্যক্তির স্বজনরাও এমনটিই বলেছেন। তাদে অভিযোগ, অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতা নেই। পরিস্থিতি ও যাত্রীর অসহায়ত্ব বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই গলাকাটা ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শোকাহত পরিবারের সদস্যরা তখন প্রতিবাদ বা বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করার মতো অবস্থায় থাকেন না।
স্থানীয়দের দাবি, যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সেই দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও এর আগে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এফ এম শামীম আহম্মদ বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনার, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং র্যাব-৫-এর অধিনায়কের কাছেও লিখিতভাবে অভিযোগ পাঠানো হয়। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ভাড়া তালিকা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, হাসপাতাল এলাকায় ডিজিটাল ভাড়া প্রদর্শন ব্যবস্থা চালু, সরকারি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স সংযোজন, বাইরের অ্যাম্বুলেন্সের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক হেল্পডেস্ক চালু করা গেলে এ ধরনের সিন্ডিকেটের প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।
রামেকের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শুধু অ্যাম্বুলেন্স নয়, হাসপাতালে আরও অনেক সিন্ডিকেট রয়েছে। যেখানে হাসপাতাল থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের কর্তারা জড়িত। এ সিন্ডিকেট নির্মূল করা অসম্ভব, যদি না এসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সদিচ্ছা হয়।’
নাগরিক সংগঠন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি লিয়াকত আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হাসপাতাল এলাকায় সক্রিয় রয়েছে।’ তার মতে, এ সমস্যার সমাধানে পুলিশ প্রশাসন, সিভিল প্রশাসন, সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে একটি কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির সারাবাংলাকে বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের মাধ্যমে বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায়, তা খতিয়ে দেখা হবে।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।