Tuesday 25 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রংপুরে হত্যাকাণ্ড / ইয়াবা সেবনের পর ৪ জনকে খুন, যেভাবে সাজানো হয় ডাকাতির নাটক

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৫ আগস্ট ২০২৬ ২২:৫৯ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৫৪

রংপুর: রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের ৪ সদস্য হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ মোট ৯ পিস ইয়াবা সেবন করেছিল। পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি, আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি, ময়নাতদন্তের ফল এবং ঘটনাস্থলের আলামত—সবকিছু মিলিয়ে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের চিত্র। তবে পুলিশের বক্তব্য নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ও আন্দোলন চলছে। রহস্য উদঘাটনে ইতিমধ্যে তদন্তভার ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং পুলিশ কমিশনারকেও বদলি করা হয়েছে।

৯ পিস ইয়াবা, একের পর এক খুন

বিজ্ঞাপন

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে প্রথমে প্রতিবেশী সীমান্তের বাড়িতে ৩ পিস ইয়াবা সেবন করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। এরপর মাদক কারবারি শান্তর কাছ থেকে আরও কয়েক পিস ইয়াবা কেনেন তারা। পরে প্রতিবেশী দেবুদের তিনতলা নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে পানির ট্যাংকের পাশে বসে আবারও ইয়াবা সেবন করতে থাকেন।

সিদ্ধার্থ পুলিশকে জানিয়েছে, ইয়াবা সেবন করতে করতে ভোর হয়ে যায়। তখন ছাদে ওঠেন গণপতি চক্রবর্তী। তিনি তাদের ধমক দেন এবং এখানে কী করছেন জানতে চান। সিদ্ধার্থের ভাষ্য, তখন তাদের মাথা কাজ করছিল না। মানসম্মানের ভয়ে এবং ঘটনা জানাজানির আশঙ্কায় তারা গণপতির গলায় থাকা গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। পরে মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখেন।

ছাদে টিনের শব্দ পেয়ে ওঠে আসেন স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী। মুগ্ধ গামছা দিয়ে প্রীতিলতার গলা পেঁচিয়ে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ আগামীর গলা ও মুখ চেপে ধরেন। প্রায় ৪-৫ মিনিট সময় লেগেছিল আগামীর প্রাণ যেতে—জবানবন্দিতে জানিয়েছে খুনিরা। পরে রশি ও গামছা দিয়ে আগামীকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর নিচে নেমে ঘুমন্ত ছেলে প্রিয়মকে দেখে ফেলেন। প্রিয়ম সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরেছিল—এ কারণেই তাকেও হত্যা করা হয়। শিশুটিকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে খুন করা হয়।

হত্যার পর যা করেছিল খুনিরা

চারটি খুনের পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ বাড়িতে সিসি ক্যামেরার সন্দেহে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। এরপর তারা বাড়ির ওয়াশরুমে গোসল করে এবং বসে আরও ১ পিস ইয়াবা সেবন করে। ফ্রিজ থেকে শসা ও ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর খায় তারা।

ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ডাকাতির নাটক সাজায়—ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে। বাসায় থাকা কিছু স্বর্ণালংকার ও ১৫ হাজার টাকা নিয়ে জুমার নামাজের সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। মুগ্ধ নেয় ১৫ হাজার টাকা। পেশায় স্বর্ণ কারিগর সিদ্ধার্থ আগুন দিয়ে গহনা পরীক্ষা করে আসল-নকল শনাক্ত করে। পরে প্রতিবেশী পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পাশে মাটিতে সোনা পুঁতে রাখে। ঘটনার পর সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন ছিল, তিনি একটি ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসাও নেন।

ময়নাতদন্তে যা জানা গেল

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, চারজনের মৃত্যু শ্বাসরোধে হয়েছে। কারও চোয়াল ভাঙা বা চোখ বের হওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এছাড়া মুখমণ্ডল ঝলসানোর ঘটনাটি পচনের কারণে হয়েছে, কোনো এসিড বা রাসায়নিক ব্যবহারের চিহ্ন নেই। ধর্ষণেরও কোনো প্রাথমিক আলামত পাওয়া যায়নি। পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে ময়নাতদন্তের কিছু অসঙ্গতি রয়েছে—যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল খুনিরা

পুলিশ জানিয়েছে, খুনিরা সিসি ক্যামেরার ভয়ে এবং বাড়িটি অন্ধকার রাখতে বিদ্যুতের মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। সিআইডির এসপি সুমিত চৌধুরী জানান, মিটারের কাছে তার কাটায় শর্ট সার্কিটও হতে পারে—এটা টেকনিক্যাল বিষয়।

তদন্ত ও প্রশাসনিক পরিবর্তন

এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে গ্রেফতার হয়। তারা রাতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সোমবার (২৪ আগস্ট) মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির ওসি জিন্নাত আলী জানান, প্রয়োজনে দেশের যেকোনো স্থানে গিয়ে তদন্ত করা হবে।

এছাড়া সোমবারই রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদকে বদলি করে নতুন কমিশনার হিসেবে বিশেষ শাখার ডিআইজি মাহবুবুর রশিদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পুলিশের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান, বিক্ষোভ ও ৩ দিনের আলটিমেটাম

পুলিশের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক-বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী, মহিলা পরিষদ ও নাগরিক কমিটি বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে। তারা পুলিশের বর্ণনাকে ‘সাজানো নাটক’ বলে দাবি করেছেন।

বিক্ষোভকারীরা বলেছেন, ‘দুই মাদকসেবী কীভাবে পরপর চারজনকে হত্যা করে শান্ত মাথায় গোসল করে খাবার খেতে পারে? এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়।’

তারা প্রশাসনকে তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়ে বলেছেন, প্রকৃত রহস্য উদঘাটন ও প্রকৃত দোষীদের গ্রেফতার না করা হলে রংপুর নগরী অচল করে দেওয়া হবে। তারা বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন।

শার্ট নিয়ে বিতর্ক

পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী ও আসামি সিদ্ধার্থের পরনে একই রকম শার্ট দেখা গেলে বিতর্ক তৈরি হয়। তবে সনাতন চক্রবর্তী জানান, তার শার্টটি তার কাছেই আছে এবং তিনি আরং থেকে কিনেছিলেন। আসামির পরিবারও জানিয়েছে, আটকের সময় সিদ্ধার্থের গায়ে ছিল কালো গেঞ্জি, ওই শার্টটি তার ছিল না।

ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পার হলেও রহস্য পুরোপুরি উদঘাটিত হয়নি। তদন্ত ডিবিতে গেছে, পুলিশ কমিশনার বদলি হয়েছেন, আসামিরা স্বীকারোক্তি দিয়েছেন—তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ রয়ে গেছে। প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে সবার চোখ এখন নতুন তদন্তে।

সারাবাংলা/এসএস
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর