ঢাকা: তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। নদীশাসন, ভাঙনরোধ, বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নকে সমন্বিত করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, তিনি নিজেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা-সংক্রান্ত সরকারি কমিটিতে যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। সে কারণে প্রকল্পটির অগ্রগতি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ ধারণা রয়েছে।
তিনি জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চীনের পক্ষ থেকে একটি প্রাথমিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল নদীশাসন, ড্রেজিং, নদীর গভীরতা বৃদ্ধি এবং ভাঙন নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার চীনের সেই প্রাথমিক প্রস্তাবকে আরও সম্প্রসারিত করেছে। শুধু নদীশাসন নয়, বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উত্তরাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়েছে।’
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘তিস্তার অন্যতম বড় সমস্যা হলো ভয়াবহ নদীভাঙন। বর্ষা মৌসুমে নদীর প্রশস্ততা অনেক স্থানে প্রায় আট কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যায়। এতে প্রতিবছর হাজারো মানুষ বসতভিটা ও কৃষিজমি হারান। নদীকে নিয়ন্ত্রিত প্রবাহের মধ্যে এনে ভাঙন রোধ করা গেলে বিপুল পরিমাণ জমি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বন্যা ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।’
তিনি বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ ছাড়াও উজানে সিকিম অঞ্চলে বিভিন্ন স্থাপনার কারণে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পানি পায় না। তবে বর্ষাকালে বিপুল পরিমাণ পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও তার বড় অংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এ বাস্তবতায় বর্ষার পানি সংরক্ষণের জন্য বিদ্যমান তিস্তা ব্যারাজের পাশাপাশি আরও নিম্নাঞ্চলে নতুন জলাধার বা ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষিতে সেচের সুযোগ বাড়বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে।’
তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ তার ন্যায্য পানির দাবি থেকে সরে এসেছে। সরকার তিস্তা চুক্তি সম্পাদন, গঙ্গা চুক্তির নবায়ন এবং ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন ৫৩টি নদীর পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। দেশের জনগণের কল্যাণ ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোকেও সম্মান করা হবে। তবে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা অন্য কোনো দেশের আপত্তির ওপর নির্ভর করবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি প্রসঙ্গেও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘সেবা গ্রহণে ঘুষ ও অনিয়মের যে চিত্র বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, তা কেবল রাজনৈতিক সরকারের দায় নয়; রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। সংবিধান অনুযায়ী সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং সেবা প্রদানের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’ সরকার দুর্নীতি কমাতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং আগামী বছর এ বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বৃদ্ধির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের তথ্য ও অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়টি তদন্ত করবে এবং সরকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ফলে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। যাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি অভিযোগ বা মামলা নেই, তারা ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।
‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ প্রসঙ্গে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকাকালে নতুন বা ভিন্ন নামে দলটির কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সরকারের অবস্থান হলো- আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থাও জোরদার করেছে।’
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ কানেক্টিভিটি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকার এমন যেকোনো আঞ্চলিক যোগাযোগ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখে, যা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করে।’
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। পৃথিবীর যেকোনো ধরনের কানেক্টিভিটি যদি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে সরকার সেটিকে স্বাগত জানাবে।’
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার হয়ে যে কানেক্টিভিটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়নের আগে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আঞ্চলিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতাসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করা হবে। এসব মূল্যায়নের পরই সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।’
তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘অতীতে চীন, মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও ভারতকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি উদ্যোগের আলোচনা হয়েছিল। একইভাবে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে বিভিন্ন সংযোগ উদ্যোগ নিয়েও কাজ হয়েছে। সরকার মনে করে, বহুপক্ষীয় ও বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরদার হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হবে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার মাল্টিমোডাল, মাল্টি-সেক্টর এবং বহুদেশীয় কানেক্টিভিটি উদ্যোগের প্রতি আগ্রহী। তবে যেকোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে এর সম্ভাব্যতা, জাতীয় স্বার্থ এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’