ঢাকা: ঋণের প্রচলিত কঠোর বিধিমালা নানা ফোঁক-ফাকরে বিশেষযোগ-সাজসে গত এক দশকে ব্যাংকের বিপুল অর্থ লুটপাট করেছে পতিত সরকারের মদদপুষ্ট এস আলম গংরা। শুধু তাই নয়, সুযোগ লুফে নিয়েছেন খোদ ব্যাংক পরিচালকরাও। নিজেদের ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সীমা (নিজস্ব শেয়ারের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ) থাকায় পরিচালকরা কৌশলে আতাত করে অন্যান্য ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। যার সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি হয় ২০২৪ সালের জুলাইতে গণ-অভ্যত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের মাস খানেক আগে। সেই বছর জুনে ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আর ক্ষমতার পালা বদলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৬ মাসেই ডিসেম্বরে পরিচালক ঋণ কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটিতে। কিন্তু ২০২৫ সালের জুন থেকে ফের উর্ধ্বমুখী হয় ঋণের ধারা। যা বর্তমান সরকার গঠনের পর গত জুনে মাত্র ৪২ টি ব্যাংকের কাছে ঋণ দাড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। পরচিালকদের ঋণ নিয়ে নির্বাহীরাও বিপাকে বলে বলে জানা সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের কয়েকজন প্রধান নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিচালকদের ঋণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পর্ক, যোগসাজশ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকও ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী হয় না। আর ব্যাংক আগ্রহ দেখালেও সংশ্লিষ্ট পরিচালক আদালতে যান। অপরদিকে বেশির ভাগই প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় জানার পরেও ঘটছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অসহায়ত্ব প্রকাশই একমাত্র পথ।
সূত্র জানায়, ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ নতুর সরকার আসার পর আবার বাড়ছে। মূলত ক্ষমতা এবং প্রভাবের কারণে বিশেষ আঁতাতে তারা নিজ ব্যাংকের পাশাপাশি অন্যান্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। নিয়ম অনুযায়ী কিস্তি না দিয়ে তা নিয়মিত দেখান। এতে তারা খেলাপি থেকে মুক্তি পান। পরিচালক পদ ধরে রাখেন। যদিও যথাযথ নিয়ম মানলে তারা খেলাপি হবেন। এককালীন পরিশোধে পরিচালকরা শোধ দেখিয়ে সেই টাকা আবার ব্যাংক থেকে ঋণ করে তুলে নেন। যা নির্বাহীরা অসহায়ভাবে অনুমোদন করেন। এসব ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংকের জানা। কিন্তু ব্যবস্থা নেয় না। কেননা, পরিচালকদের হাত সরকার পর্যন্ত বলে জানানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংক পরিচালক স্বাভাবিকভাবে প্রভাবশালী। তাদের কাছে অনেক ঋণ আটকা। এই বিপুল পরিমাণ ঋণ আদায়ে মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে ব্যাংককে। পরিচালক হলে সব মাফ করতে হবে, তা নয়। আর ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছ হবে অসহাত্ব না দেখিয়ে ব্যাংকের চেয়ারম্যারেন সঙ্গে কথা বলা। সেখানে সমাধান না পাওয়া গেলে ঋন আদায়ে উপায় চাইতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে উপায় বের করতে পারে। তখন একটা ফলাফল আসবে। সেখানে সব ক্ষমতা দেখানো যায় না।’
পরিচালক ঋণের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংক খাতে সঙ্কটের শুরুটা ২০১৩ সালে। এ সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্তত ৯টি ব্যাংক অনুমোদন পায়। এসব ব্যাংকের অধিকাংশ পরিচালক ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ব্যাংকে অবৈধ প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। যদিও এস আলম, সালমান এফ রহমান, নজরুল ইসরাম মজুমদার, জয়নুল হক সিকদার সঙ্ঘবদ্ধ চক্র আরো আগে থেকে ব্যাংক খাতে মাফিয়া হিসাবে পরিচিতি পায়। তবে ২০১৭ সালে এর আলমের ইসলামী ব্যাংক জবর দখরের মাধ্যমে ব্যাংক লুটপাদের শঙ্কা সৃষ্টি হয়। তখন থেকে ব্যাংক পরিচালকরাও বেপরোয়া হতে থাকেন। কেননা, ২০১৬ সালে পরিচালকদের ঋণ ছিল মাত্র ৯০ হাজার কোটি টাকা। যা ১০ বছর পর গত জুনে গিয়ে দাড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার কেটি টাকা।
তথ্য অনুযায়ী, নিজ ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে — পূবালী ব্যাংক লিমিটেড, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়ার, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সাউথইস্ট ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ণ ব্যাংক, এবি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি)।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাম না করার শর্তে জানান, পদ-পদবির প্রভাব খাটিয়ে বিশেষ যোগ-সাজস এবং আতাতের মাধ্যমে গত ১০ বছরে ব্যাংকিং খাত থেকে অন্তত দেড় লাখ কোটি টাকা কোটি টাকা নিয়েছেন পরিচালকেরা। সবগুলো ব্যাংক থেকে গত জুন পর্যন্ত শুধু পরিচালকেরাই নিয়েছেন ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের দেওয়া ঋণের শীর্ষ ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে —পূবালী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সাউথইস্ট ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ণ ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সম্প্রতি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন দেখা করতে গেলে তিনি খেলাপি আদায়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে পরিচালকদের বরিুদ্ধে যোগ-সাজসে ঋণ ভাগাভাগি করার বিষয়টি নজরে আনেন। তাদেরকে ব্যাংক পরিচালনায় নিয়ম মেনে চলার তাগিদ দেন।
এ ব্যাপারে ঢাকা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, এখন ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। পরিচালকেরা ব্যাংক খাতের উন্নয়নে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ম অনুযায়ী চলছে। যথাযথ নিয়ম মেনে যাচাই-বাছাই করেই ঋণ বিতরণ করা হয়। সে ক্ষেত্রে পরিচালকদের ক্ষেত্রেও ঋণ পেতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ঋণ পাওয়া তো দোষের কিছু না। ব্যাংক কোম্পানি আইনে নিয়মের বিষয়ে বলা রয়েছে।
তথ্য বলছে, ২০২০ সালে করোনাকালে পরিচালকদের ঋণ ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার কোটি। করোনা শেষে ২০২২ সালে তা হয় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি। ২০২৩ সালে মার্চে পরিচালক হিসাবে পরিবারের লোকজন অস্বাভাবিকভাবে নিয়োগ পাওয়ায় সেই অঙ্কটা ৭০০ ছাড়িয়ে যায়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালে আইন সংশোধন করে এক পরবিারের থেকে পরিচালক কমিয়ে ৩ জনে নামিয়ে আনে। সেই বছর মার্চে পরিচালকদের ঋণ ছিল ২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। যা ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরে বেড়ে জুনে জুন গিযে হয় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা সর্বোচ্চ রেকর্ড। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে সরকারের পালাবদলের পর ১৪ টি ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন করায় আগের অন্তত ২০০ পরিচালক বাদ পড়েন। এতে একই বছর ডিসেম্বরে পরিচালক ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি। কিন্তু পালা বদলের পর বর্তমান সরকারের মন্ত্রীসহ তাদের সমর্থিত লোক বোর্ড জাযগা করে নেয়। এর পর বাড়তে থাকে পরচিালক ঋণ। ২০২৫ সালে জুনে গিয়ে পরিচালকদের ঋণ ২ লাখ ৪ হাজার কেটি টাকা। যদিও বাংরাদেশ ব্যাকের মুখপাত্রে দপ্তর দাবি করেছে তা প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। তবে চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. এমকে মুজেরী বলেন, ব্যাংক পরিচালকরা প্রয়োজেন ঋণ নিতে পারেন। তারাও সাধারন গ্রাহকের মত শর্ত ও বন্ধকী সম্পদ রেখ ঋণ নিবেন। ব্যাংকের উচিত ঋণের মানদন্ড মেনে চলা। যাতে ঋণ আদায় সেদিকে কেলয়াল রেখে ঋণ বিতরণ করা। কোন বাড়তি সুযোগ সুবধিা দওেয়া উচিত নয়। আর বিশেষ যোগ-সাজস বা আতাতের মাধ্যমে শর্ত মেনে ঋণ বিতরন না করলে আগের মত সংকট ফের দেখা দিবে। যা এখনো রয়ে গেছে। মানুষের আস্থা কমে গেছে ব্যাংকের ওপর। এখন সময় এসে গেছে এরকম অপসংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার। কেননা, চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তারাই আবার ব্যাংকের মালিক। আর ব্যাংক পরিদর্শনে যা আসবে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক এমডি জানান, ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ বিতরণ ও তার ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এই পরিচালকেরা ব্যবসায়ী, তাঁরাই আবার ব্যাংকের উদ্যোক্তা। তারা ঋণ নেন ও খেলাপি হন এবং আবার ঋণ নেন। এসব বেশ কিছুদিন ধরে চলছে। এটা ব্যাংক ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ও খেলাপির বিষয়ে নজর দিচ্ছে না। আইন থাকার পরেও পরিচালকেরা ঋণ পরিশোধ করছেন না। এতে স্পষ্ট অনুমান করা যায়, দেশের আইনের চেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক পরিচালকেরা। তাঁদের হাতে ঋণ কুক্ষিগত থাকায় অন্যরা ঋণ পাচ্ছেন না। এর সমাধান হতে পারে একমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক পরিচালকরা প্রয়োজনে ঋণ নিতে পারেন। কিন্তু সীমা অতিক্রম করার সুযোগ নেই। এত টাকার ঋণ মালিকদের কাছে গেল কীভাবে? নিয়ম, অনুযায়ী তাদের কাছে এত টাকা থাকার সুযোগ আছে কনিা তা খতিয়ে দখো উচিত। আর খেলাপিরা তো পরিচালক থাকতে পারেন না। আর ব্যাংক গুলো কেন ব্যবস্থা নয়ে না। এভাবে কতদনি চলবে। এর একটা সূরাহা দরকার।