Friday 21 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

‘এটা তো সিনেমা, কোনো ছেলেখেলা নয়!’

আহমেদ জামান শিমুল
৭ এপ্রিল ২০২১ ১৫:০৯ | আপডেট: ৭ এপ্রিল ২০২১ ১৬:৫৭

আসিফ ইকবাল জুয়েল— নীরব, রোশান ও বুবলিকে নিয়ে নির্মাণ করছেন ‘চোখ’। তরুণ এ নির্মাতার চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার যাত্রা প্রায় এক যুগের। সে গল্পসহ অন্যান্য বিষয়ে কথা বলেছেন সারাবাংলার সঙ্গে। শুনেছেন সিনিয়র নিউজরুম এডিটর আহমেদ জামান শিমুল

চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেমের শুরু কীভাবে?

চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেমটা কীভাবে শুরু হয়েছে তা মনে করতে না পারলেও এটা বলতে পারি, সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়ায় ছোটবেলা থেকে সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ছিল। আমি বড় হয়েছি সাতক্ষীরায়। আমাদের পুরো পরিবার সংস্কৃতিকমনা। আমার বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন দিবসে নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। আমাদের গ্রামটি সীমান্তবর্তী ছোট্ট একটা গ্রাম হলেও বলতে পারেন আদর্শ গ্রাম। মানুষগুলো খুব সংস্কৃতিকমনা।

বিজ্ঞাপন

সে জায়গা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করার পর মিডিয়াতে কাজ করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আসলে আমি খুব স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলাম। আমার পক্ষে ৯টা ৫টা অফিস করা সম্ভব ছিল না। এ কারণে কোনো চাকরি করিনি।

মিডিয়াতে কাজ করার ইচ্ছা থেকে সহকারী পরিচালক হতে চাইলাম। আমার ভগ্নিপতি আমাকে একজনের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে তানভীর মোকাম্মেল স্যারের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। তিনি বললেন, ওখানে কোর্স করো, কিছু শেখো, আগে কিছু বোঝার চেষ্টা করো।

এক পড়ন্ত বিকেলে তানভীর মোকাম্মেল স্যারের ধানমন্ডি বা কলাবাগানের বাসায় গিয়েছিলাম । স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, কেন এ পেশায় আসতে চাই। উনি আমাকে সরাসরি নার্সিং হয়তো করেননি, কিন্তু আমার এখানে আসার পেছনে ওনার অবদান অনেক। ওনার বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিউটে ভর্তি না হলে আমি পরিচালক হতে পারতাম না। ওখানে চূড়ান্ত যে পরীক্ষাটা হয়, সেখানে আমি দ্বিতীয় হয়েছিলাম। প্রথম হয়েছিল জাহাঙ্গীনগরের একটা মেয়ে। ও এখন পরিচালনা করে না। আমার স্বপ্নের দুয়ারটা ওখানেই খুলে গিয়েছিল। আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট ওটা। এরপর আমি স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্মাণ করি। যেটার প্রযোজক ছিলেন আমার বাবা।

স্বল্পদৈর্ঘ্যের পর বেশকিছু নাটক নির্মাণ করেছেন। আমাদের দেশের তরুণরা এ সময়কে তাদের চলচ্চিত্রকার হওয়ায় প্রস্তুতি হিসেবে ধরেন। এ সময়টা অনেকেরই কাছে সুখকর হয় না। অনেকের স্বপ্নভঙ্গও হয়। আপনারও নিশ্চয় এমন হয়েছে?

অবশ্যই সুখকর না। বলা হয়, জীবন ফুলের বিছানা না। আপনি সহজে কিছু পাবেন না। আমার মনে হয় সুখকর জার্নি দিয়ে যারা আসে তারা বেশি দিন টিকতে পারে না। আমার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ছিল ‘ফিরে আসা ৭১’। তানভীর মোকাম্মেল স্যারের ছাত্র হিসেবে বের হয়েই এটি বানাই। এটি বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রদর্শিত হয়েছে। ২০১০ সালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী করেছিল স্টার সিনেপ্লেক্স। ওইখানে প্রায় ১০০ ছবির মাঝে তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলামদের সঙ্গে আমার ছবিটাও জায়গা করে নিয়েছিল। প্রদর্শনীর দিন ভিতরে ঢুকতেই লজ্জা পাচ্ছিলাম। পরে আমাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়, যা আমাকে বেশ অনুপ্রেরণা দেয়।

তারপর আমি নাটকে চলে আসি। নাটকে আমি নিজের মতো করে কাজ করতে চেয়েছি। ফলে নাটকও কম করা হয়েছে।

কম করার কারণ?

বাজেট একটি বড় বিষয়। হয়তো নাটকের বাজেট তিন লাখ, প্রযোজক দেখা যেত বলছেন দুই লাখের মধ্যে বানিয়ে দিতে। তখনো নাটকের বাজার যেমন ছিল, এখনো তেমন রয়েছে। ওই টাকায় বানাতে গেলে ভালোভাবে বানানো যেত না।

চলচ্চিত্রে আসতে দেরি হলো যে?

ফিল্মের গল্প নিয়ে আমি তিন বছর ঘুরেছি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে গল্প নিয়ে আমি তিন-চার বছর ঘুরেছি ওই গল্প নিয়ে আমি এখনো ঘুরছি। ওটার বাজেট অনেক বেশি লাগবে। ওই গল্প নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এ গল্পের (চোখ) প্রযোজক পেয়ে গেলাম। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ছবি নির্মাণ মাঝখানে একদমই নাই হয়ে গিয়েছিল। সে জায়গা থেকে আমি শাপলা মিডিয়ার সেলিম খানের কাছে কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে প্রথম সিনেমা করার সুযোগ দিয়েছেন। আমার গল্প অনুযায়ী বাজেট ও শিল্পী সবকিছুর ক্ষেত্রে উনি আমাকে পুরো স্বাধীনতা দিয়েছেন।

চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করে আসা তরুণ নির্মাতাদের মাঝে একটা প্রবণতা দেখা যায় তারা চলচ্চিত্রের নিয়মিত যারা, তাদের বাইরে থেকে শিল্পী নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু আপনি তা করেননি।

আমার গল্পটায় থ্রিলার, লাভ স্টোরি ও ভৌতিক এরকম তিনটা পার্ট আছে। আমার এখানে নীরব, রোশান, বুবলি ও শহীদুজ্জামান সেলিমদের চরিত্রগুলোতে তাদেরকেই লাগত। এটা যদি কর্মাশিয়াল মুভি না হতো, তাহলেও আমি ওনাদেরকে নক করতাম। বলতাম এ চরিত্রগুলোতে আপনাদেরকে লাগবে। ওই জায়গায় আমি খুব ভাগ্যবান, আমি তাদের পেয়েছি।

বুবলী তো অনেকদিন কাজের বাইরে ছিল। ‘চোখ’ দিয়েই সে কামব্যাক করছে। ওর গল্পটা খুবই পছন্দ হয়েছিল। যার কারণে সে কাজটা করতে উৎসাহী হয়েছিল।

আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে দিন শেষে আপনার গল্প, শিল্পী ও মেকিং যদি ভালো না হয় তাহলে প্রোডাকশনটা ব্যর্থ। ভালো গল্প হলে দর্শক দেখবে। আমাদের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে আমরা আমাদেরকে নব্বইয়ের দশক বা ২০০০ সালের পর আর নিজের কোনো পরিবর্তন করতে পারিনি। যার কারণে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। একটা জেনারেশন গ্যাপ হয়েছে।

এর থেকে উত্তরণ হবে কি?

এখন কিন্তু ৩৫ মি.মি. তে ছবি হচ্ছে না। ডিজিটালে মেমোরি কার্ডে শুট করছি। এখন কিন্ত সুযোগ এ গ্যাপটা পূরণ করার। এখন না পারলে আর হবে না। এখন কিন্তু জেলায় সিনেপ্লেক্স হচ্ছে। পাঁচ বছর পর দেখবেন জেলায় জেলায় সিনেপ্লেক্স হয়ে যাবে। তখন কিন্তু রুচিশীল ও মার্জিত ছবি দেখতে চাইবে মানুষ। ওখানে কিন্তু পরিবর্তনটা আনতে হবে। অবশ্য সেটা শুরু হয়ে গেছে। আমি আশাবাদী বাংলাদেশের সিনেমা ঘুরে দাঁড়াবে।

তরুণ নির্মাতাদের পক্ষে এ পরিবর্তনটা আনা সম্ভব? নাকি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা লাগবে?

না, সবার সম্মিলিত চেষ্টা লাগবে। কারও একার পক্ষে সম্ভব না। কাজের সঙ্গে আপস করা যাবে না। কাজের সঙ্গে যখন আপস করবেন, তখনই শেষ হয়ে যাবেন।

‘চোখ’-এর শুটিংয়ের কী অবস্থা?  

ছবির মূল শুটিং শেষ। এডিটিং বাকি।

কোথায় শুটিং করেছেন?

আমরা শুটিং করেছি নারায়ণগঞ্জসহ দেশের কয়েকটা রিসোর্টে। বাংলাদেশে এখন এত সুন্দর সুন্দর রিসোর্ট হচ্ছে, সেগুলোতে বিদেশের ফ্লেভার পাওয়া যায়। একটু বুদ্ধি খাটিয়ে ফ্রেম ধরলে মনে হবে এটা দেশের বাইরে।

একটা ছবির জন্য ফ্রেমিং নাকি গল্প ও মেকিং জরুরি?

গল্প তো অবশ্যই। ফিল্মের জন্য প্রথম জিনিস হচ্ছে গল্প। গল্প থেকে হয় স্ক্রিপ্ট। ভালো গল্প ও স্ক্রিপ্ট নেওয়ার পর সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য আপনার একটা ভালো টিম দরকার। পুরো বিষয়টা একটা টিম ওয়ার্ক। আপনি ভালো টিম না পেলে যত ভালো পরিচালক হন না কেন, ভালো আউটপুট দিতে পারবেন না।

তানভীর মোকাম্মেল স্যারের কাছে যখন ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করেছিলাম, তখন তিনি একটা কথা বলতেন— ‘একটা ভালো স্ক্রিপ্ট থেকে ভালো, মন্দ দুই ধরনেরই ছবি হতে পারে। কিন্তু একটা খারাপ স্ক্রিপ্ট থেকে কখনো ভালো ছবি হয় না।’

এখানে যে ছবিগুলো বিভিন্ন জায়গায় পুরস্কার পায়, সেগুলো নিয়ে বিতর্ক হয়। বিষয়টাকে কীভাবে দেখেন?

হলিউড বা বলিউডের যে সিনেমাগুলো পুরস্কার পাচ্ছে সেগুলো কিন্ত দর্শক দেখে। কিন্তু আমাদের দেশে পুরস্কারের ছবিগুলো একেবারেই নির্দিষ্ট কিছু দর্শকের বাইরে কেউ দেখে না।  এখানেও একটা ব্যাপার আছে, যেটা ধরতে হবে। যেমন তৌকির ভাই ভালো ভালো ছবি বানাচ্ছেন। আপনি মুগ্ধ হয়ে দেখবেন। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে ছবিগুলো কেন যেন সফলতা পাচ্ছে না, বুঝচ্ছি না! হয়তো আস্তে আস্তে দর্শকদের রুচি পরিবর্তন হবে। দর্শকের রুচি তৈরি করার দায়িত্বটা আসলে পরিচালকের। কলকাতায় ‘অটোগ্রাফ’ ছবির পর থেকে দর্শকদের মধ্যে কিন্তু পরিবর্তন এসেছে। এখন জিৎ-দেবও ওই ধরনের ছবি করছে।

তাহলে কি পরিচালকরা নতুন গল্প নিয়ে নিরীক্ষা করার সাহসটা দেখাচ্ছেন না?

সাহস আছে। যেমন কিছু দিন আগে ‘কাঠবিড়ালি’ হলো। তবে আমাদের আরেকটু প্রফেশনাল হতে হবে। বাজেটটা বাড়াতে হবে।

একটা ভালো ছবির জন্য সবসময় ভালো বাজেট কতটা জরুরি?  

অবশ্যই ভালো বাজেট লাগবে। না হলে তো আপনি ছবিতে সঠিক জিনিসটা দিতে পারবে না। আপনি কোটি টাকা বাজেটের কোনো গল্প নিয়ে প্রযোজকের কাছে গেলেন, তিনি হয়তো বললেন ৫০ লাখে কাজটা করতে। আপনি রাজিও হলেন এই ভেবে যে কাজটা আগে করি। কিন্তু কাজটা শেষ পর্যন্ত ভালো হয় না।

‘অটোগ্রাফে’র কথায় বলি, ওই ছবির গান, মেকিং সবই অসাধারণ হয়েছে। এখন বাজেট না পেলে কিন্তু তা হতো না। আমি আমার ছবির কথায় বলি। আমি কিন্তু সবদিক থেকে প্রযোজক থেকে যথেষ্ট সাপোর্ট পেয়েছি। আর এটা কিন্তু আদায় করে নিতে হয়। পরিচালক হিসেবে আপনার যা লাগবে তা প্রযোজককে আপনার বোঝাতে হবে। এটা তো সিনেমা, কোনো ছেলেখেলা নয়! আমি একটা দোকানের শট নিচ্ছি, এর আশেপাশে কিছু নাই দেখাই, তাহলে কি জিনিসটা ভালো লাগবে বলেন? আর দেখাতে গেলেই আমার বাজেট লাগবে।

আপনার পরবর্তী পরিকল্পনা…

আমি আপাতত নাটকে নেই। গত বছরের ভালোবাসা দিবসে সবশেষ নাটক বানিয়েছিলাম।। যেটায় ছিল তানজিন তিশা ও জোভান। আমি আসলে পুরো সিস্টেমের কারণে ক্লান্ত হয়ে গেছি। এখানে শিল্পীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। একজন শিল্পীকে যদি সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দুই-তিনশ শ পরিচালক ফোন দেয়, তাহলে উনি কী করবেন, বলেন? সামনে আমি নতুন সিনেমার পরিকল্পনা করেছি। তবে অবশ্য ‘চোখ’ শেষ করার পরে।

সারাবাংলা/এজেডএস