Monday 13 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

অন্ধ সমর্থন কি ঈমান পরিপন্থী?

সারাবাংলা ডেস্ক
১৩ জুলাই ২০২৬ ১৮:০৫

মানুষ স্বভাবগতভাবেই নিজের পরিবার, দল বা মতাদর্শের প্রতি এক ধরনের টান অনুভব করে। এই সহজাত ভালোবাসা বা পছন্দ কোনো অপরাধ নয়; কিন্তু তা যখন অন্ধ সমর্থনে রূপ নেয় এবং সত্যের পথকে আড়াল করে, তখনই সমাজে অবিচারের জন্ম হয়। বর্তমানের চরম বিভক্ত সমাজে নিজের পক্ষের ভুলকে কৌশলে ঢেকে রাখা আর প্রতিপক্ষের ভালোকে সরাসরি অস্বীকার করা এক নিয়মিত সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ একজন প্রকৃত মুমিনের আসল পরিচয়ই হলো, যেকোনো পরিস্থিতিতে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা।

আসুন জেনে নেই, পক্ষপাতিত্ব নিয়ে ইসলামের নির্দেশনাগুলো…

১. অন্ধ দলপ্রীতি বা ‘আসাবিইয়াহ’ বর্জন

কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই কেবল নিজের বংশ, গোষ্ঠী বা দলের অন্ধ অনুকরণ ও সমর্থন করাকে ইসলামে ‘আসাবিইয়াহ’ বলা হয়েছে। এই ধরণের অন্ধ প্রীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি মানুষকে অন্ধ দলপ্রীতির দিকে ডাকে, এর ভিত্তিতে লড়াই করে কিংবা এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুবরণ করে, সে ইসলামের আদর্শের বাইরে। নিজের দলের অন্যায়কে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা জাহেলিয়াতের যুগের একটি অন্যতম কুপ্রথা।

বিজ্ঞাপন

২. কথা ও মতামতে ন্যায্যতা রক্ষা

দৈনন্দিন আড্ডায় বা যেকোনো আলোচনায় আমরা প্রায়ই কাছের মানুষের বড় ভুলকেও হালকা করে দেখাই, অথচ অন্যদের ছোট ত্রুটি নিয়েও কঠোর সমালোচনা করি। আল্লাহর নির্দেশ হলো, শুধু আনুষ্ঠানিক বিচারে নয়, সাধারণ কথাবার্তা বলার সময়ও যেন আমরা ইনসাফ বজায় রাখি—এমনকি সেই বিষয়টি যদি নিজের নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেও যায়।

৩. সম্পর্কের ঊর্ধ্বে সত্যের অবস্থান

ন্যায়বিচারের স্বার্থে ইসলাম কোনো ধরনের আপস পছন্দ করে না। কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি তা নিজের, মা-বাবার কিংবা একদম কাছের আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও যায়, তবুও একজন মুমিনকে ন্যায়ের ওপর দৃঢ় থাকতে হবে। সম্পর্কের খাতিরে সত্য গোপন করা প্রকৃত ঈমানদারের কাজ হতে পারে না।

৪. অপ্রিয় বা শত্রুপক্ষের প্রতিও সুবিচার

যাকে আমরা পছন্দ করি না বা যার সাথে আমাদের মতবিরোধ রয়েছে, তার প্রতিও যেন কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ করা না হয়—এটি ইসলামের অন্যতম কঠিন একটি পরীক্ষা। পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে। সুবিচার বজায় রাখাই একজন মানুষকে খোদাভীতি বা তাকওয়ার সবচেয়ে কাছাকাছি নিয়ে যায়।

৫. পারিবারিক জীবনে বৈষম্যহীনতা

অনেক সময় পরিবার থেকেই অজান্তে পক্ষপাতিত্বের চর্চা শুরু হয়। মা-বাবা যদি এক সন্তানকে অন্য সন্তানের চেয়ে বেশি প্রাধান্য বা সুযোগ-সুবিধা দেন, তবে তা সন্তানের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়। সন্তানদের প্রতি আচরণ ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) মা-বাবাকে আল্লাহর ভয় বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন।

৬. তথ্য যাচাই না করে অন্ধ সমর্থন বন্ধ করা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে নিজের পছন্দের ব্যক্তি বা দলের পক্ষে কোনো খবর এলে অনেকেই তা যাচাই না করে লুফে নেন এবং ছড়িয়ে দেন। অথচ যেকোনো খবর পাওয়ার পর তার সত্যতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে ইসলামে কড়া নির্দেশ রয়েছে। তথ্যের সত্যতা না জেনে শুধু নিজের বলয়ের মানুষের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সমাজে বড় ধরনের ফিতনা তৈরি করতে পারে।

৭. সংশোধনের মাধ্যমে প্রকৃত সহযোগিতা

কাউকে ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে তার অপরাধ বা জুলুমকেও সমর্থন করতে হবে। ইসলামে জালিম ও মজলুম উভয় ভাইকেই সাহায্য করার কথা বলা হয়েছে। মজলুমকে সাহায্য করার অর্থ হলো তাকে অন্যায়ের হাত থেকে বাঁচানো, আর জালিমকে সাহায্য করার অর্থ হলো তাকে অন্যায় ও জুলুম করা থেকে বিরত রাখা বা সংশোধন করা। প্রিয়জনকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনাই তার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা।

ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত

ইসলামের ইতিহাসে আইনের শাসন কতটা কঠোর ছিল, তার প্রমাণ মেলে মক্কার এক প্রভাবশালী বংশের নারীর চুরির ঘটনা থেকে। তাঁর শাস্তি মওকুফের জন্য যখন সুপারিশ করা হয়েছিল, তখন আল্লাহর রাসুল (স.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছিলেন যে, পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংসই হয়েছে প্রভাবশালী ও দুর্বলদের জন্য আলাদা আইনের কারণে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যদি তাঁর নিজের সন্তান ফাতেমাও এই অপরাধ করত, তবে আইনের হাত থেকে সে-ও রেহাই পেত না।

সারাবাংলা/এনএল/এএসজি