মানবজীবন সুখ-দুঃখের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। কখনো জীবনের আকাশটা আলোয় উদ্ভাসিত থাকে, আবার কখনো ঘোর দুর্যোগের কালো মেঘ এসে চারপাশ ঢেকে দেয়। এই দুঃখ-কষ্ট বা বিপদ-আপদ কিন্তু আকস্মিক কোনো বিষয় নয়, বরং তা ঈমানদারের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ পরীক্ষা। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি কারা হন? তিনি জবাবে বলেন, ‘নবীগণ, তারপর যারা তাদের নিকটতম, তারপর যারা তাদের নিকটতম…’। অর্থাৎ, ঈমানের দৃঢ়তা অনুযায়ীই মানুষের পরীক্ষা কঠিন হয়। তাই দুঃসময় মানেই শেষ নয়, বরং ভুল শুধরে আল্লাহর আরও কাছাকাছি যাওয়ার এক মহিমান্বিত সুযোগ।
আসুন জেনে নেই, পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঘোর বিপদের মুহূর্তগুলোতে একজন মুমিনের পথচলা কেমন হওয়া উচিত এবং কীভাবে আল্লাহর অশেষ রহমত ও সাহায্য লাভ করা সম্ভব…
আল্লাহর দিকে পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবর্তন ও তাওয়াক্কুল
কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য না হারিয়ে সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে নিজের ভুলত্রুটির জন্য তওবা করা এবং তার ওপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখা জরুরি। বিপদ দেওয়ার মালিক যেমন আল্লাহ, সেখান থেকে উদ্ধারের একমাত্র ক্ষমতাও তারই। সূরা লুকমানে আল্লাহ সমুদ্রে ঝড়ের কবলে পড়া মানুষের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, চরম সংকটে মানুষ যেভাবে একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহকেই ডাকে, জীবনের যেকোনো দুঃসময়েও ঠিক সেভাবেই একাগ্রচিত্তে তার দরবারে ফিরে আসতে হবে।
দোয়ায় আকুতি ও দোয়া কবুলের বিশেষ সময়ের ব্যবহার
আল্লাহ তাআলা তার কাছে সাহায্য প্রার্থনাকারীর ডাকে সাড়া দিতে ভালোবাসেন। বিপদ থেকে মুক্তির জন্য আকুল হয়ে দোয়া করা আবশ্যক। দোয়া কেবল দুর্যোগ দূর করে না, বরং অশান্ত অন্তরে এনে দেয় প্রশান্তির ছোঁয়া। তবে কিছু বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে যখন দোয়া দ্রুত কবুল হয়—যেমন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে (তাহাজ্জুদ), আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে এবং প্রতি শুক্রবার সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্তে। এসব সময়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে সাহায্য চাওয়া উচিত।
ধৈর্য ধারণ ও নিরবচ্ছিন্ন জিকির
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধরা ঈমানের দাবি। আর এই সময়ে অন্তরকে প্রশান্ত রাখার সেরা উপায় হলো বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা। সূরা আনফালে আল্লাহ সফলতার পূর্বশর্ত হিসেবে অধিক পরিমাণে জিকিরের নির্দেশ দিয়েছেন। আর সূরা রাদের ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘জেনে রাখ, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়।’ নিরবচ্ছিন্ন জিকির মানুষকে সব ধরনের গুনাহ ও হতাশা থেকে মুক্ত রাখে এবং আল্লাহর খাস রহমত ত্বরান্বিত করে।
জীবনের অন্ধকার রাত যতই দীর্ঘ হোক না কেন, ভোরের আলোর আগমন সুনির্দিষ্ট। বিপদ-আপদ মানুষের গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম। তাই দুঃসময়ে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর ওপর অটল আস্থা রাখা, দোয়ায় কান্নাকাটি করা এবং ধৈর্যের সাথে জিকিরে মগ্ন থাকাই একজন মুমিনের আসল পরিচয়। আসুন, জীবনের প্রতি পদে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকি এবং তারই শেখানো পথে সাহায্য কামনা করি।