রংপুর: রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যার কারণ নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে বারবার পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে ডাকাতির কথা বলা হলেও পরে মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কারণ হিসেবে দাবি করা হয়। দুজন গ্রেফতার হলেও এই ভিন্ন বক্তব্য ও ঘটনার নানা দিক নিয়ে এখনও প্রশ্ন থেকে গেছে।
চারটি মৃত্যু, কয়েক দফা বক্তব্য
রংপুর নগরীর কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় শনিবার রাতে উদ্ধার করা হয় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী (২৩) ও ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ। চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা। উদ্ধারের সময় বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল এবং আসবাবপত্র তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়।
ঘটনার পর পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে ডাকাতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ঘর তছনছ এবং মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার স্থান ভাঙা অবস্থায় পাওয়ায় লুটপাটের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়নি। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বক্তব্যে বড় পরিবর্তন আসে। রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ মিয়া জানান, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াই ছিল হত্যার কারণ।
পুলিশের দাবি, স্থানীয় দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) গণপতি পরিবারের বাড়ির পাশের ভবন থেকে ছাদে উঠে ইয়াবা সেবন করছিল। গণপতি তাদের বাধা দিলে তারা প্রথমে তাকে এবং পরে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। হত্যার পর বাড়িটি ডাকাতির মতো সাজানো হয় এবং তারা গোসল করে ফ্রিজ থেকে খেজুর খেয়ে পালিয়ে যায়।
শোকাহত স্বজনদের প্রশ্ন
নিহত প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাত থেকেই পরিবারের সবার ফোন বন্ধ ছিল। শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে তিনি স্বামীকে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে তালাবদ্ধ দরজা ও ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্র দেখতে পান। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘একজন শিক্ষক, তার স্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে এবং স্কুলপড়ুয়া ছেলে—চারজনকে এভাবে হত্যা করল কারা? তাদের শত্রু ছিল না।’
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ স্থানীয় এবং বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিল। তাদের একজন আটককালে তুঁতবাগানে লুকিয়ে ছিলেন, পরে দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও সোনার গয়না পরীক্ষার চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তদন্তে বাকি প্রশ্ন
যদি এটি ডাকাতি না হয়, তাহলে কেন ঘর তছনছ করে ডাকাতির আবহ তৈরি করা হয়েছিল? হত্যার আগে না পরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল? চারজনকে একসঙ্গে হত্যা করলেও কেন মরদেহগুলো বাড়ির বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেল? হত্যাকাণ্ডের সময় কোনো চিৎকার বা ধস্তাধস্তির শব্দ প্রতিবেশীরা শুনেছিলেন কি? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
ঘটনার পর রংপুর জিলা স্কুল ও কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে বিচার দাবি করেছে। গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা চালাতেন। তার মেয়ে কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছেন এবং ছেলে রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ, সিআইডি ও ডিবির একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত ও গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পরই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
একটি পরিবার, চারটি জীবন—গণপতি চক্রবর্তী তার ছাত্রদের ভালো-মন্দ কাজের হিসাব রাখার শিক্ষা দিতেন। তার নিজের পরিবারকে কে, কেন এবং কীভাবে মৃত্যুর খাতায় তুলে দিল, এই হিসাবের উত্তরই এখন খুঁজছে রংপুরের মানুষ।