নওগাঁ: ‘ঘটনা ঘটছে কতদিন হয়া গেল, আর লাশ পাঠাইলো আজকা! এতগুলো দিন আমি ঘুমাইতে পারি নাই। আগুনে আমার ছেলে দুটাকে একবারে কয়লা বানায়া দিছে। নিজের চোখটারে বিশ্বাস করতে পারতেছি না যে, এরা আমার সেই সোনা বাজান। আল্লাহ, তুমি আমারে এত বড় কষ্ট কেন দিলা?’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামের ময়না খাতুন। সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে তার দুই ছেলে সুমন আলী ও মোহন আলী নিহত হয়েছেন। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁদের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে ছেলেদের লাশ দেখে এভাবেই আহাজারি করেন তিনি।
গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৯ জনের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সাতজনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রশাসনের সহায়তায় বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে মরদেহগুলো আত্রাইয়ে পৌঁছায়। পরে শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে সাতজনের একসঙ্গে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্বজনেরা সেগুলো নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান।
জানাজায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, নওগাঁর জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।
নিহত ৭ জন হলেন—আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী এবং বজলুর রহমানের ছেলে কলিমউদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার।
লাশ ফিরতেই গ্রামে কান্নার রোল
গণ্ডগোহালী, উদনপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কান্নার রোল পড়ে যায়। স্বজনদের কেউ দুই হাত তুলে সন্তানের জন্য দোয়া করছিলেন, কেউ শেষবারের মতো প্রিয়জনের নাম ধরে ডাকছিলেন। কেউ আবার নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন মরদেহের দিকে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বজনেরা প্রিয় মানুষটির মরদেহ ফিরে পেলেও সেখানে ছিল না কোনো স্বস্তি। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষগুলোকে হারিয়ে শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেক পরিবার।
ময়না খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে দুটো বলত, মা, আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফিরব। দেশে এসে বাড়ির কাজ শেষ করব। তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে সুখে থাকব। আমার দুনিয়া থেকে সবকিছুই চলে গেল। আমার আর কিছু থাকল না।’
তিনি বলেন, তাঁর স্বামীও প্রতিবন্ধী। এখন সংসার কীভাবে চলবে, তা নিয়ে তিনি দিশেহারা। সরকারের কাছে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানান তিনি।
‘ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে গিয়ে পেলাম লাশ’
গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত কলিমউদ্দিনের বাবা বজলুর রহমান বলেন, ‘বিদেশে গেল আমাগো ভাগ্যের চাকা ঘুরাইতে, আর আমরা পাইলাম ওর লাশ! কয়দিন পর পর শুনি আগুনে কত মা-বাপের কোল খালি হয়। ওখানকার ফ্যাক্টরিতে কোনো নিরাপত্তা আছিল না কেন? আমার ছেলের মতো আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়।’
একই গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এর আগে এতগুলো মরদেহ কখনো দেখিনি। এ ঘটনার পর থেকেই গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যে ছেলেগুলো মারা গেল, তারা সবাই পরিবারের উপার্জনের প্রধান ভরসা ছিল। তাঁদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবেও ভেঙে পড়েছে।’
উদনপৈ গ্রামের নিহত ফরিদের মা সাফিয়া খাতুন বলেন, ‘ছেলেটাই আছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। পেটের টানেই তোরে পাঠাইছিলাম দেশের বাইরে। আগুনে সব শেষ হয়া গেল রে! এখন আমি এই সংসার নিয়া কই যামু?’
ডুবাই গ্রামের সোহেল রানার বাবা বাদল তরফদার বলেন, ‘একটা সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় দেশের বাইরে পাঠায়ছিলাম। এখন আমার তো আর কেউ নাই রে বাবা! তোরে বুকে ধইরা কষ্ট কইরা মানুষ করছিলাম। তুই ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কে আছিল? আমার বুড়া বয়সের লাঠিটারে কে কাইড়া নিল রে আল্লাহ।’
এখনো শনাক্ত হয়নি ৫ জনের মরদেহ
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১২ বাংলাদেশির মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাঁদের মরদেহ কবে দেশে ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন স্বজনেরা।
আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালী গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘কতদিন ধইরা ছেলের মুখটা দেখার জন্য ব্যাকুল হইয়া আছি। হামার ছাওয়ালের লাশ নাকি শনাক্ত হয়নি, এ জন্য পরে আসবে। শেষবার একটু ছোঁয়াও পাব না? সরকারের কাছে আবদার, হামার ছেলের লাশ য্যান দ্রুত নিয়ে আসে।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘একসঙ্গে নওগাঁর ১২ জন বাসিন্দা সৌদিতে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনা খুবই দুঃখজনক। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাঁদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এসব সহযোগিতা নিহতদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, বাকি মরদেহগুলো দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর দ্রুত তাঁদের মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে।