Wednesday 01 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

চুক্তি নাকি মরীচিকা, ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধবিরতি কি আদৌ বাস্তবে রূপ নেবে?

আয়শা আফরোজা, নিউজরুম এডিটর
১০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫৬ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫৮

‘একটি আস্ত সভ্যতার মৃত্যু ঘটতে পারে’- মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ইরানকে ট্রাম্পের দেওয়া আলোচিত সেই আল্টিমেটাম শেষ হতে তখনও তিন ঘণ্টা বাকি ছিল। কেইনসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা তখন একটি ভয়াবহ সামরিক অভিযানের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের সহকারীরা সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এর মধ্যে ছিল, প্রেসিডেন্ট যদি জাতির উদ্দেশে ভিডিও ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে হেগসেথ ও কেইনকে প্রস্তুত রাখা। ঠিক সেইসময় শীর্ষ দুই মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা—প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকে হোয়াইট হাউসে তলব করা হয়। ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বিজ্ঞাপন

নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার ৯০ মিনিট আগেই, ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ঘোষণা করেন যে দুই সপ্তাহের জন্য তিনি হামলা স্থগিত করেছেন এবং একইসঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে যাচ্ছেন। এর মাধ্যমে ‘আজ রাতেই একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’— সেই ভয়াবহ হুমকির অবসান ঘটে।

ট্রাম্পের এই আকস্মিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা বিশ্বব্যাপী তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনে দেয়। কিন্তু এই ঘোষণার বিষয়ে ট্রাম্প এবং ইরান আসলে কী একমত হয়েছিল? তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। তাছাড়া, এর মধ্যে দিয়ে আরেকটি প্রশ্ন উঁকি দেয় তা হলো- যুক্তরাষ্ট্র তার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য—হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া কি আসলেই হাসিল করতে পেরেছে?

বার্তা সংস্থা সিএনএন-কে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবগত করা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ঠিক কী করতে চলেছেন, সে বিষয়ে কেউই পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না।

ইরানের দেওয়া ১০-দফা শর্ত ‘আলোচনার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি’—ট্রাম্পের এমন ঘোষণার এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পরেই অচলাবস্থার প্রথম আভাস পাওয়া যায়। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বিজয়ের ঘোষণা দিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। বিবৃতিটিকে ভুয়া দাবি করে, দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার সেই বয়ান প্রচার করার জন্য ট্রাম্প সিএনএন-এর সমালোচনা করেন।

যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ৪০ দিনের যুদ্ধ শেষ হতে যাচ্ছে। ছবি রয়টার্স

যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বুধবার (৮ এপ্রিল) বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি তেলবাহী ট্যাঙ্কারের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে যান চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই সংকীর্ণ প্রণালির বাস্তব চিত্র যে খুব একটা বদলেছে, তার কোনো ইঙ্গিত এখনও পাওয়া যায়নি।

বুধবার ইরান বলেছিল যুদ্ধবিরতি এরমধ্যেই লঙ্ঘিত হয়েছে। তারা লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমা হামলার কথা উল্লেখ করেছে, কারণ চুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তখনও মতবিরোধ চলছিল।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি কার্যকর থাকলেও, তা ট্রাম্পের সামনের চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ট্রাম্প এখন ৪০ দিনের একটি যুদ্ধের অবসান ঘটানোর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। যে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করলেও এই সত্যটি বদলায়নি যে—ট্রাম্পের শত চেষ্ট সত্ত্বেও—ইরানে এখনও সেই পুরোনো শাসন ব্যবস্থাই আছে এবং বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহও যে একেবারেই বন্ধ তাও নয়।

সিএনএন-এর বৈশ্বিক বিষয়াবলী বিশ্লেষক এবং সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত ব্রেট ম্যাকগুর্ক, যিনি পূর্বে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন, তিনি বুধবার সিএনএন-এর ‘দ্য অ্যারেনা’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা আজ উপসাগরীয় অঞ্চলে কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইনের বিরুদ্ধে ইরানের কয়েকটি বৃহত্তম হামলা দেখেছি; এমনকি সৌদি আরবেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।’

ম্যাকগুর্ক আরও বলেন, ‘আমরা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং জাহাজ গণনা করতে পারি, জাহাজগুলো চলাচল করছে কি না তাও দেখতে পারি, এবং এখন পর্যন্ত, এই সমস্ত সূচক অন্তত আজ ভুল দিকেই গেছে।’

বুধবার গভীর রাতে ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ সতর্ক করে বলেন যে, ইরান যদি শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করতে প্রস্তুত।

তিনি লিখেছেন, ‘যতক্ষণ না সম্পাদিত প্রকৃত চুক্তিটি সম্পূর্ণরূপে মেনে চলা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত মার্কিন জাহাজ, বিমান এবং সামরিক কর্মী, অতিরিক্ত গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র ইরানের অভ্যন্তরে ও তার আশেপাশে অবস্থান করবে।’

ইসরায়েলি বিমান হামলার পর লেবাননে ধোঁয়া উড়ছে। ছবি: এপি

এখন আলোচনার পরবর্তী পর্ব এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দিকে সমগ্র বিশ্ব তাকিয়ে আছে। কারণ ভ্যান্স, মার্কিন দূত স্টিভ উইকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে আলোচনার জন্য পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হয়েছন।

যুদ্ধবিরতি এবং লেবানন নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে বুধবার হাঙ্গেরি ছাড়ার সময় ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি ছিল ভুল ধারণা। আমার মনে হয়, ইরানীরা ভেবেছিল যে যুদ্ধবিরতির মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু আসলে তা ছিল না। আমরা কখনও এমন প্রতিশ্রুতি দিইনি। আমরা কখনও এমন কোনও ইঙ্গিতও দিইনি। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যা বলেছিলাম তা হলো, যুদ্ধবিরতিটি ইরানকে কেন্দ্র করে হবে এবং আমেরিকার মিত্র, অর্থাৎ ইসরায়েল ও উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোকে কেন্দ্র করে হবে।’

যদিও পরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘যত দ্রুত সম্ভব’ লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তার দাবি, লেবাননের পক্ষ থেকেই আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনও জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সরাসরি আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এতে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

জোসেফ আউন বলেন, ‘লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতির একমাত্র সমাধান হলো ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানো। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান আলোচনা পরিস্থিতি শান্ত করতে ভূমিকা রাখবে।’

আলোচনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে পাকিস্তানিদের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে ভ্যান্স একজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ছিলেন। সূত্রগুলো আরও জানায়, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী চুক্তির বিষয়ে বেশ কয়েকটি আলোচনার মধ্যে প্রথম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আগামী দুই সপ্তাহ দুপক্ষ আলোচনায় বসবে। এ সময় তারা একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। তবে এই আলোচনার পথ সহজ হবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্টের নজিরবিহীন হুমকি ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এর আগে ইরান এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে ট্রাম্পের এই উসকানিমূলক ঘোষণা এর আগে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আর দেখা যায়নি। সেখানে তিনি অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেছিলেন।

যদি এই যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তিও আনে, তবু ইরান যুদ্ধ ও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশ্ববাসীর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বদলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এক সময় নিজেকে বিশ্ব শান্তির রক্ষক হিসেবে পরিচয় দিত। কিন্তু এখন তারা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে।

ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে বলে দাবি করেন।। এমনকি লক্ষ্যের চেয়েও বেশি কিছু পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন।

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি অনেক কমেছে। দেশটিতে বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলেও অনেক শীর্ষ নেতা বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান ভূরাজনৈতিক কৌশলী ড্যান আলামারিউ সিএনএনকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরান একটি যুদ্ধবিরতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। দেশটির শাসনব্যবস্থা দুর্বল হলেও টিকে আছে। ইরান মূলত এই প্রণালিকে ব্যবহার করে একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনা করছে।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক লক্ষ্য এখনও অর্জিত হয়নি। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থা কী, তা এখনও অজানা। অথচ এটিই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল ভিত্তি। এ ছাড়া ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর ইরানের প্রভাব এখনো কমেনি।

ইরান বিনা শর্তে হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেও এই জলপথের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখন আগের চেয়ে স্পষ্ট। বিশ্ব এখন বুঝতে পারছে, এই গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পয়েন্টটি ইরান কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে ‘পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশ বিজয়’ বলে দাবি করেছেন। তবে চুক্তির শর্তগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হাতে রেখে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কতটা কার্যকর প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছে ইরান।

বিবিসি বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি ইরান খুলে দেওয়ার ওপর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া না-হওয়া নির্ভর করছে। এর মানে হলো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল পরিবহনের পথ এবং এর মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তেহরানের যে বিশাল প্রভাব, তা একপ্রকার পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে, ট্রাম্প কড়া হুমকি দিয়ে নিজের উদ্দেশ্য সফল করেছেন সত্যি তবে এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি সাময়িক স্বস্তি, কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

প্রেসিডেন্টের এই আগ্রাসী আচরণ ও যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে কী ক্ষতি হলো, তা মূল্যায়ন করার সময় এখনো আসেনি। পুরো বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর