হিমালয়ের পাদদেশে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা ৩৮৯ জন ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মরদেহ থাকার আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে উজানে নতুন করে একটি জলাধারসদৃশ হ্রদ তৈরি হওয়ায় ফের বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে স্থানীয় পুলিশের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকারীরা এখন পর্যন্ত ৩৮৯টি মরদেহ উদ্ধার করেছেন। নেপাল ও চীনের তিব্বত জুড়ে অন্তত ৮০০ জন বিদেশিসহ প্রায় ১৫০০ জন নিখোঁজ হয়েছেন।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার পর ৯১০ জন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
সীমান্তের উভয় পাশেই নিখোঁজদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশি পর্যটক। নেপাল জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭৮ জন ভারতীয়, ১২৭ জন নেপালি, ৬৫ জন আমেরিকান এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া অনেক সেনা ও পুলিশ সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তিব্বতের জিরং কাউন্টিতে নিখোঁজের সংখ্যা ৫৫৮ জন, যার মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
এদিকে আজ নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এর মধ্যে নুয়াকোট জেলার বিদুর ও এর পার্শ্ববর্তী জনপদগুলো রয়েছে।
বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, অনুসন্ধান কার্যক্রমে অংশ নিতে নেপাল সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং জাতীয় পুলিশের ১৩ হাজারের বেশি সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া দিনজুড়ে পরিচালিত ৬৯টি ফ্লাইটের মাধ্যমে ৫৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
বন্যার কারণে রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসার সংযোগকারী প্রধান সড়কটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই পথটি হাইকার, ট্র্যাকার এবং পুণ্যার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে থাকা হাজার হাজার মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণ পৌঁছাতে এবং জীবিতদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে নেপালের উদ্ধারকারী দল।
চীনা কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি সেবা কার্যক্রম জোরদার করেছে। তবে দুর্যোগের পরিধি বড় হওয়ায় নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষীণ হয়ে আসছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছে, আজ তিব্বত অংশের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। আগের দিন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সর্বাত্মক উদ্ধারকাজ চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।
উল্লেখ্য, বুধবার (২৬ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে এ আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটে। স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশের বড় একটি খণ্ড ভেঙে পড়ে। প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে পড়ে যাওয়ার সময় বরফের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলি যুক্ত হয়। এই বরফ-পাথরের বিশাল ধস তিব্বতের লেন্দে নদীতে গিয়ে পড়ে। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি নদীটির ওপর ধ্বংসাবশেষ সাময়িকভাবে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করে। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ হঠাৎ করে নিচের দিকে ছুটে যায়। এর ফলেই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও কাদার স্রোত।