ঢাকা: একাত্তর ও চব্বিশের গণহত্যা এবং গত ১৬ বছর ধরে দেশের সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের দায়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং তৎকালীন গণহত্যার বিচার সংশ্লিষ্ট সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে চলমান রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ঢালাও মামলার আড়ালে ‘মামলা বাণিজ্য’ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারিক কার্যক্রমে ধীরগতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এদিনের সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তব্যের শুরুতেই আন্দোলনের সব শহিদ, আহত ও ত্যাগী ভাই-বোনদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তিনি বলেন, আজকের দিনটি অত্যন্ত ঐতিহাসিক। ২০২৪ সালের এই ১৪ই জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই রাতেই চীন সফর থেকে ফিরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কটূক্তি করেন।
তিনি আরও বলেন, এই অপমানের জবাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলসহ সারা দেশের ক্যাম্পাস থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগানে রাজপথে নেমে আসে এবং আন্দোলনটি একটি রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারীদের এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দিনটিকে ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ হিসেবে পালন করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারকেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে এখনও নানা ষড়যন্ত্র ও অপব্যাখ্যা চলছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় মিডিয়া এই গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, আন্দোলনের অন্যতম শরিক রাজনৈতিক দল বিএনপির কোনো কোনো সংসদ সদস্য এখন সংসদে দাঁড়িয়ে এবং টকশোতে গিয়ে এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কথা বলছেন।
নাহিদ আরও বলেন, তারা আন্দোলনে মানুষের আত্মত্যাগ ও স্নাইপারের উপস্থিতিকে অস্বীকার করে একে ‘সাজানো ছক’ বা ‘ডিজাইন’ বলে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন। এমনকি পুলিশের মৃত্যুর সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের তুলনা করে আওয়ামী লীগের তৈরি করা মিথ্যা বয়ান প্রচার করছেন। এই ধরনের ইতিহাস বিকৃতির রাজনীতির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
সারাদেশে দায়ের হওয়া ঢালাও মামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ৫ই আগস্টের পর প্রায় ১ হাজার ৪৯৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী রিপোর্টের সূত্র ধরে তিনি জানান, যাচাইকৃত ৪০টি মামলার মধ্যে ২১টি মামলা হওয়ার আগে বা পরে আসামিদের কাছ থেকে অর্থ লেনদেন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার পেছনে তৃণমূলের বিএনপি নেতারা জড়িত। বাকি ১৯টি মামলা ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা ব্যাবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে করা হয়েছে। এই মামলাগুলোতে মূল গণহত্যাকারীদের পাশাপাশি সম্পূর্ণ নিরীহ ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে খোদ বিএনপিরই ভিন্ন কোরামের নেতাকর্মীদের ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই হয়রানিমূলক মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার বর্তমান অবস্থা কী তা স্পষ্ট করতে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বর্তমান প্রসিকিউশন টিমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর আগের সফল প্রসিকিউশন টিমকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা মেলেনি। বর্তমানে ট্রাইবুনালের রায় এবং নতুন ৩টি মামলায় যে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তার সব তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া আগের প্রসিকিউশন টিমই শেষ করে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রসিকিউশন নতুন কোনো মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে নিতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও বর্তমান সরকার ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত। তাই ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত ও সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ এবং ট্রাইব্যুনাল বাড়ানোর বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সংসদে পেশ করার তাগিদ দেন তিনি।
ইতিহাসে দুই দুইবার গণতন্ত্র ও দেশের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস এবং গণহত্যা চালানোর অপরাধে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করে তিনি বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচারের স্বার্থে দলগতভাবে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করতেই হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইবুনালের রায় ইতোমধ্যে হয়েছে আমি নিজেও এই মামলার অন্যতম একজন সাক্ষী। তবে রায় দেওয়াই শেষ নয়, দিল্লির সঙ্গে দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পলাতক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে এই রায় অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।