ঢাকা: প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত একটি শক্তিশালী ‘এল নিনো’ জলবায়ু পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাবে আগামী মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপদাহ, খরা এবং অনাবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়া দেখা দিতে পারে।
জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক সংস্থা (ডব্লিউএমও) শুক্রবার প্রকাশিত তাদের মাসিক ‘গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট’-এ এই চরম আবহাওয়ার সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনো এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি আরও দ্রুত শক্তিশালী রূপ ধারণ করবে। এর ফলে বিশ্বের বহু অঞ্চলে তাপদাহ, খরা, অনাবৃষ্টি এবং অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা অনেক বেড়ে যাবে। সম্ভাব্য এই বিপর্যয় ও প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের সব দেশকে আগে থেকেই সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
এল নিনো হলো মূলত একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া প্রক্রিয়া, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এই জলবায়ুগত পরিবর্তন দেখা দেয় এবং এর স্থায়িত্বকাল থাকে প্রায় নয় থেকে বারো মাস পর্যন্ত।
ডব্লিউএমও সাধারণত এল নিনোর তীব্রতাকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী ও অতি শক্তিশালী, এই চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে থাকে। বছরের নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই পরিস্থিতি সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছায়, তবে এর ফলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির মূল প্রভাবটি পরে আরও বড় আকারে প্রকাশ পায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আবহাওয়া চক্রটি তৃতীয় সর্বোচ্চ অর্থাৎ ‘শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু কেন্দ্রগুলোর বিভিন্ন মডেলভিত্তিক পূর্বাভাসে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রের তাপমাত্রা ধারাবাহিক ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা মিলেছে। এবার সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন। আবহাওয়া মডেলে এই পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার মিল ও স্পষ্টতা পাওয়া গেছে। উত্তর গোলার্ধের শরৎকালজুড়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব বিশ্বের বহু অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করবে। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশ, পুরো অস্ট্রেলিয়া এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ভারত মহাসাগরের কিছু অংশে গড় বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টিপাতের এই ঘাটতির কারণে এশিয়ার দেশগুলোতে শস্য উৎপাদন ও গবাদি পশুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে, যা সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
জলবায়ুর এই ভয়াবহ পরিবর্তনের বিষয়ে ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্টে সাউলো বিশেষ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল আগে থেকেই উত্তপ্ত থাকায় এল নিনোর প্রভাব এবার আরও বেশি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রের মধ্যেও তীব্র তাপদাহের ঝুঁকি তৈরি হবে। মানুষের জীবন ও জীবিকার ক্ষতি কমাতে তিনি বিশ্বজুড়ে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, উন্নত মৌসুমী পূর্বাভাস এবং আগাম সতর্কবার্তা মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং অর্থনীতি ও সমাজের ওপর আঘাত প্রশমিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডব্লিউএমওর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ডব্লিউএমও কমিউনিটি ইতিমধ্যেই জাতিসংঘ এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে তাদের কার্যক্রমের সমন্বয় বাড়াতে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জলবায়ুর প্রতি সংবেদনশীল খাত যেমন কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা সংস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সম্ভাব্য প্রভাবের জন্য প্রস্তুত করতে এই সমন্বয় বাড়ানো হচ্ছে। এই গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেটটি মূলত ইন্ডিয়ান ওশেন ডাইপোল এবং আটলান্টিক মহাসাগরের পরিস্থিতি বিবেচনা করে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নিরক্ষীয় আটলান্টিক অববাহিকাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ থাকার ইঙ্গিত রয়েছে।