ঢাকা: জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে উঠে এসেছে বাংলাদেশ সার্ভে বা বিএস জরিপের বিভিন্ন ভুল ও অনিয়মের চিত্র। এই জরিপজনিত জটিলতা ও অসংগতির কারণে দেশের আনুমানিক সাত থেকে দশ শতাংশ জমি মালিক বিচারালয়ের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এই ধরনের মামলা-মোকদ্দমায় ঠিক কতজন নাগরিক জড়িত আছেন, সে বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যভান্ডার বা সংরক্ষিত পরিসংখ্যান নেই।
রোববার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে এই সার্বিক পরিস্থিতি প্রকাশ করেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান।
তিনি জানান, উদাহরণ হিসেবে ঢাকা মহানগর জরিপে প্রায় চার লাখ চল্লিশ হাজার ৪১টি খতিয়ান তৈরি করা হয়েছিল। যার বিপরীতে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৪০ হাজার মামলা দায়ের হয়। বিএস জরিপের ভুলের কারণে কতজন নাগরিক দেওয়ানি আদালত ও ট্রাইব্যুনালে মামলা মোকাবিলা করছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত না থাকলেও মামলা সংক্রান্ত প্রশাসনিক বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত।
সংসদে উত্থাপিত প্রশ্নে সংসদ সদস্য অভিযোগ আনেন যে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাবশালী মহলের অসাধু হস্তক্ষেপ ও অনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত মালিক এবং দীর্ঘদিনের ভোগদখলকারীদের স্বার্থ চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। বিএস জরিপের সময় জমির দাগ নম্বর, বাটা দাগ, জমির পরিমাণ, সীমানা বা চৌহদ্দি, অবস্থান এবং মালিকানার বিবরণ অদলবদল ও পরিবর্তনের নানা অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রসঙ্গে লিখিত জবাবে ভূমিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই মাঠ জরিপ কার্যক্রম সনাতন বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হওয়ায় মাঠপর্যায়ে কিছু অনৈতিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় মূল রেকর্ডপত্রে কারচুপি করা হয়ে থাকতে পারে। এমনকি নথিপত্র বা রেকর্ড ভলিউম বাঁধাইয়ের সময়ও সরকারি নথিতে অনিয়ম করার সুযোগ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, অনৈতিক প্রভাব এবং সঠিক নজরদারির অভাবে প্রকৃত পাওনাদারদের নাম বাদ পড়ায় বেশ কিছু অভিযোগ ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরে এসেছে। প্রাপ্ত অভিযোগগুলো সঠিকভাবে খতিয়ে দেখে বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক উপায়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বিএস জরিপের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ভূমিমন্ত্রী জানান, এই জরিপ মূলত ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে শুরু হয় এবং ১৯৯০-৯১ সালের মধ্যে অধিকাংশ এলাকার খসড়া নকশা ও পর্চা বিতরণ করা হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে দীর্ঘ ২০ থেকে ৪০ বছর সময় পার হয়ে গেলেও জরিপের সকল প্রক্রিয়া শেষ করে জেলা প্রশাসকের দফতরে চূড়ান্ত রেকর্ড হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। জেলা প্রশাসকের কাছে রেকর্ড হস্তান্তরের পর জরিপ অধিদফতরের আইনি ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায় ।
ভূমিমন্ত্রী আরও বলেন, দেওয়ানি আদালত বা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে না গিয়েও প্রশাসনিক ভুলের ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসারদের মাধ্যমে দ্রুত রেকর্ড পুনরীক্ষণের সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া পুরনো সিএস, এসএ ও আরএস খতিয়ানের সঙ্গে নতুন রেকর্ড মেলাতে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ও বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে। ডিজিটাল উপায়ে অনিয়ম খতিয়ে দেখার পাশাপাশি অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।