ঢাকা: জাতীয় সংসদ অধিবেশনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে অতিরিক্ত ৯০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
রোববার (৩০ আগস্ট) সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলের নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ-এর আনীত সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে এই তথ্য তুলে ধরেন মন্ত্রী।
ওই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, অতিরিক্ত বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া ঠিকাদারকে নতুন করে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। বরং মূল লক্ষ্য হলো প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিশাল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে দ্রুত সচল করে তা থেকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা। এর আগে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য অভিযোগ তুলে ধরে জানান, আন্তর্জাতিক এই টার্মিনালের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ১৩ হাজার কোটি টাকা থাকলেও তা কয়েক দফায় বেড়ে ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। উক্ত প্রকল্পে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) দপ্তর থেকে তদন্ত পরিচালনা করে প্রায় ৪ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত করার তথ্য উঠে আসে।
একই সাথে অনিয়মের কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও এবং প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯৯.৯১ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার পর শেষ মুহূর্তে আবারও ৯০২ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বিরোধী দলীয় প্রতিনিধির প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে গিয়ে বিমানমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে শুধুমাত্র অবকাঠামোগত ভবন উদ্বোধন করে কাজ সমাপ্ত হিসেবে দেখানোর একটি অকার্যকর প্রবণতা লক্ষণীয় ছিল। প্রকৃতপক্ষে থার্ড টার্মিনাল ভবনের ভেতরে থাকা মূল্যবান মেশিনারিজ, প্রয়োজনীয় বার্তা ও প্রযুক্তিগত সংকেত সংযোজনের জটিল কাজগুলো সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। ফলে টার্মিনালে রক্ষিত প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় সম্পদ দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণে একদিকে যেমন রাষ্ট্র বা সরকার এই বিশাল অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছিল না, অন্যদিকে প্রকল্পটির অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাপানের জাইকা (JICA) থেকে নেওয়া ঋণের বড় অঙ্কের কিস্তি ইতিমধ্যেই নিয়মিত পরিশোধ করা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু পুরো অবকাঠামো সময়মতো সচল করতে না পারার কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কোনো আয় যুক্ত হচ্ছিল না।
অধিবেশনে বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক অবস্থান পরিষ্কার করে মন্ত্রী বলেন, দায়ভার গ্রহণের পর সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্পের সার্বিক হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। পর্যালোচনার ভিত্তিতে দেখা যায় যে, টার্মিনালের বাকি থাকা অবশিষ্ট কাজগুলো চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করা, ঠিকাদারের পূর্বে থাকা বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা এবং আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার পাওনা মিটিয়ে এই বৃহৎ অবকাঠামো পূর্ণাঙ্গ চালুর স্বার্থে স্বচ্ছতার সাথে ৯০২ কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই অতিরিক্ত অর্থ অনুমোদন না করা হলে সুবিশাল অবকাঠামোটি সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর অবস্থায় পড়ে থাকত, যা জাতির জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর হতে পারত বলে তিনি বলেন। এই অর্থ অনুমোদন লাভ করলে অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে। এতে করে বর্তমান ১.২ মিলিয়ন যাত্রী সেবার সক্ষমতার বিপরীতে দ্বিগুণ সংখ্যক যাত্রীকে আধুনিক সেবা দেওয়া সম্ভব হবে এবং ওই আয় থেকেই সহজেই জাইকার ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে। এই লক্ষ্যেই অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে বাড়তি বরাদ্দের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া সম্পাদন করা হয়েছে।
একই সংসদ অধিবেশনে অপর এক সম্পূরক প্রশ্ন উত্থাপন করে বিমানের আকাশছোঁয়া ভাড়া ও টিকিট কালোবাজারি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। অভ্যন্তরীণ আকাশপথে উড়োজাহাজের ভাড়া এক লাফে ৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ১২ হাজার টাকায় পৌঁছানোর অভিযোগ তুলে এটি সাধারণ যাত্রীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক বলে তিনি অবহিত করেন এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ জানতে চান।
এই প্রশ্নের উত্তর প্রদানকালে বিমানমন্ত্রী বলেন, টিকিট ভাড়ার এই হিসাব নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝি বিরাজ করছে। কারণ অভ্যন্তরীণ রুটে স্বাভাবিক একমুখী বা ওয়ান-ওয়ে টিকিটের মূল নির্ধারিত দাম কখনো ১২ হাজার টাকায় পৌঁছায়নি। সচরাচর দ্বিমুখী বা রিটার্ন টিকিট ক্রয় করলে কিংবা বিশেষ কোনো কর যুক্ত হলে মোট হিসাবের ক্ষেত্রে সাময়িক সময়ের জন্য মোট মূল্য বেশি মনে হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃত প্রস্তাবে এয়ারলাইন্সের বেসিক টিকিট প্রাইস নির্ধারিত আইনি সীমার ভেতরেই সংরক্ষিত থাকে। তবে ওই বেসিক ভাড়ার ওপর সরকারকে নিয়মিতভাবে প্রায় ১৫ শতাংশ কর প্রদান করতে হয়। ফলে ট্যাক্সসহ যাবতীয় হিসাব মিলিয়ে একটি আদর্শ ওয়ান-ওয়ে টিকিটের স্বাভাবিক খুচরা মূল্য আনুমানিক ৬ হাজার ৩০০ থেকে ৬ হাজার ৪০০ টাকা দাঁড়ায় ।