Saturday 11 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আড়াই বছর ধরে আপিলে আটকা নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন মামলা

কামরুল ইসলাম ফকির, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৮ মে ২০২১ ১১:৫১

ঢাকা: নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার সাত বছর পেরিয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে রায় হয়েছে। তবে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামি পক্ষের আবেদন আড়াই বছর ধরে আপিল বিভাগে ঝুলে আছে। সাত খুন মামলার আপিল শুনানি কবে শুরু হবে তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। মামলার চূড়ান্ত নিস্পত্তি না হওয়ায় বাদী ও আসামি দুপক্ষের মাঝেই বাড়ছে হতাশা।

মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধস্তন আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগে হত্যা মামলার বিচারকাজ দ্রুত এগোলেও আপিলে বিভাগে এসে পুরোপুরি থমকে গেছে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলাটি। এর ফলে বাদীপক্ষ যেমন হত্যার বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তেমনি আসামিপক্ষও ন্যায় বিচার পাচ্ছেন না।

বিজ্ঞাপন

আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. ফরহাদ আব্বাস এ বিষয়ে সারাবাংলাকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে দ্রুত এগোলেও আপিল বিভাগে এসে থেমে আছে। এতে দুপক্ষের মাঝেই হতাশা তৈরি হচ্ছে। কবে আপিল বিভাগে এ মামলা শুনানি শুরু হবে তা বলতে পারছি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুনেছি আপিল বিভাগে শারীরিক উপস্থিতিতে বিচার কাজ শুরু হলে এ মামলার শুনানি শুরু হবে। আর বর্তমানে করোনা মহামারীর কারণে আপিল বিভাগে শারীরিক উপস্থিতিতে বিচার কাজ পরিচালনা বন্ধ আছে। আমি মনে করি দ্রুত সময়ের মধ্যে আপিল বিভাগে শারীরিক উপস্থিতিতে এ মামলার শুনানি শুরু করা উচিত।’

আপিল বিভাগে মামলা নিস্পত্তিতে ধীরগতির কারণে নিহতদের স্বজনরা দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছে। তাদের আশা হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখবে এবং রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাসান চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘করোনা মহামারির কারণে বর্তমানে লকডাউন চলছে। এখন সীমিত পরিসরে আদালত চালু আছে। আর নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো শারীরিক উপস্থিতিতে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানি হবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ মামলা ভার্চুয়াল কোর্টে শুনানি করা সম্ভব নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনা সংক্রমণ কমে এলে শারীরিক উপস্থিতিতে আপিল বিভাগের নিয়মিত আদালত চালু হলে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।’

গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে করোনা মহামারীর কারণে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ভার্চুয়ালি আদালত পরিচালনা শুরু হয়েছে। এরপর থেকে আপিল বিভাগে শারীরিক উপস্থিতি ব্যতিরেখে ভার্চুয়ালি চলছে বিচারকাজ। কবে শারীরিক উপস্থিতিতে আপিল বিভাগে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন অপহৃত হন। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে ওঠে ছয়টি লাশ, পরদিন মেলে আরেকটি লাশ। নিহত বাকিরা হলেন নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক মো. ইব্রাহীম।

আরও পড়ুন: সাত খুনের ৫ বছর, রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি স্বজনদের

ঘটনার এক দিন পর কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বাদী হয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা (পরে বহিষ্কৃত) নূর হোসেনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় ১১ মে একই থানায় আরেকটি মামলা হয়। এ মামলার বাদী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। পরে দুটি মামলা একসঙ্গে তদন্ত করে পুলিশ।

দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাব-১১-এর চাকরিচ্যুত অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম মাসুদ রানাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত। পরে নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে আসামিপক্ষ।

হাইকোর্ট ২০১৮ সালে ২২ আগস্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রেখে বাকি ১১ আসামির বিভিন্ন মেয়াদে সাজা বহাল রাখেন।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ১৫ আসামি হলেন: র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক দুই কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (চাকরিচ্যুত) এম মাসুদ রানা, সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের নেতা নূর হোসেন, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, আরওজি-১ মো. আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, সিপাহি আবু তৈয়ব আলী, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আবদুল আলিম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন ও সৈনিক তাজুল ইসলাম।

অপর ১১ আসামির দণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন হয়ে যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ১১ আসামি হলেন: সৈনিক আসাদুজ্জামান নুর, সার্জেন্ট এনামুল কবির, নূর হোসেনের সহযোগী আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান, রহম আলী, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান, সেলিম, সানাউল্লাহ, শাহজাহান ও জামালউদ্দিন। এদের মধ্যে পলাতক পাঁচ আসামি হলেন: সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম, নূর হোসেনের সহকারী সানাউল্লাহ সানা ও ম্যানেজার শাহজাহান। এ ছাড়া বিচারিক আদালতের রায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ আসামির দণ্ড বহাল রাখে হাইকোর্ট।

এরপর ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আপিল করে আসামিপক্ষ। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রয়েছে।

সারাবাংলা/কেআইএফ/একে