ঢাকা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে ১০ ডিসেম্বর। এই কর্মসূচি ঘিরে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে নানা রকমের আলোচনা। গতকাল বুধবার (৭ ডিসেম্বর) বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নয়াপল্টন। বৃহস্পতিবার (৮ ডিসেম্বর) সকাল থেকে রাজধানীতে গাড়ির সংখ্যা কম থাকলেও ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে।
পরিবহন মালিকরা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে এর আগে বিএনপি-জামায়াত নেতারা সড়কে জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন করেছিল। ওই আন্দোলনে অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার কারণে এখনো আতঙ্কিত তারা। বিশেষ করে যারা তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক গাড়ির মালিক তারা আতঙ্কিত হওয়ার কথা জানিয়ে করণীয় সম্পর্কে জানতে চান পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের কাছে। বিএনপির মহাসমাবেশের দিন অর্থাৎ ১০ ডিসেম্বর সীমিত আকারে গাড়ি চলাচলের পরামর্শও দেন তারা।
তবে তাদের আশ্বস্ত করে ১০ ডিসেম্বর রাজধানীসহ শহরতলী এবং আন্তঃজেলা রুটে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিকভাবেই চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। কোনো নাশকতার ঘটনা যেন না ঘটে এবং গাড়ি ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান সড়ক পরিবহন নেতারা। এর পাশাপাশি ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর প্রতিটি বাস টার্মিনালে পাহারা বসিয়ে যেকোনো ধরনের আপত্তিকর ঘটনা রুখে দেওয়ার কথাও জানান তারা।
বৃহস্পতিবার (৮ ডিসেম্বর) ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত হয় এই সভা। এতে রাজধানীর সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল, মহাখালী বাস টার্মিনাল, গুলিস্তান টিবিসি রোড ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালের মালিক শ্রমিক নেতাসহ ঢাকার সব পরিবহনের প্রায় শতাধিক মালিক-শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন।
সভার শুরুতেই বাস মালিকরা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন। এ সময় রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলা বাস মালিকরা বলেন, এর আগেও দেশে বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতারা রাজনৈতিক কর্মসূচির ডাক দেয় বিভিন্ন সময়। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন সড়কে হওয়া বিরোধী দলের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে অনেকেরই অপূরণীয় ক্ষতি হয়। সেই ঘটনার রেশ এখনো টানতে হয় পরিবহন মালিকদের।
তারা বলেন, রাজধানীতেই বিভিন্ন কোম্পানিতে চলা অনেকেরই শুধুমাত্র একটি গাড়িই আছে। সেই গাড়ির ইনকাম দিয়েই স্টাফ ও মালিকের পরিবার চলে। সেটার উপরে কোনো হামলা হলে বিপদে পড়তে হয় সবাইকেই।
তারা আরও বলেন, গতকাল (৭ ডিসেম্বর) নয়াপল্টনে যা হয়েছে, তা দেখে নগরবাসীর পাশাপাশি অনেকেই আতঙ্কিত। সেজন্য আজ (৮ ডিসেম্বর) অনেকেই রাস্তায় নামায়নি গাড়ি। একইভাবে সকাল থেকে যাত্রীও কম পাওয়া যাচ্ছিল। কম যাত্রী থাকলে সারাদিন বাসে যে পরিমাণ তেল খরচ হবে তার টাকাও উঠে আসবে না। এভাবে চলতে থাকলে ১০ ডিসেম্বর আসলে বাস চালানো সম্ভব না। তার উপর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অনেক সময় দেখা যায় বাস ভাঙা হয়, অগ্নিসংযোগ করা হয়। এজন্য দরকার বলে সেদিন গাড়ি না চালিয়ে রাস্তায় পার্কিং করে পাহারা বসাব।
এমন অবস্থায় একাধিক মালিক সীমিত আকারে গাড়ি চালানোর পরামর্শ দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলের জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচির কারণে বিগত সময়ে যা হয়েছে, সেই ঘটনাগুলো সাধারণ বাস মালিকদের সঙ্গে আবারও ঘটুক এমনটা কেউ চায় না। আর তাই বৈঠকে যেন সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
তবে পরিবহন মালিকদের বৈঠকে আশ্বস্ত করা হয় নিরাপত্তার বিষয়ে। পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তির কথা বিবেচনায় নিয়ে স্বাভাবিকভাবে পরিবহন চালানোর সিদ্ধান্তের বিষয়েও জানানো হয়। এ সময় গাড়ি চলাচল যাতে কোনো প্রকার বাধাগ্রস্ত না হয় সেজন্য শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে আলোচনার বিষয় উল্লেখ করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ সারাবাংলাকে বলেন, ‘১০ ডিসেম্বর যাত্রী থাকুক আর না থাকুক, গাড়ি চলবে। যদি গাড়িতে কেউ আগুন দেয়, তবে তাদের প্রতিরোধ করা হবে। সব বাস টার্মিনালে সবাইকে সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় টার্মিনালগুলোতে শ্রমিকরা থাকলেও মালিকরা থাকেন না। সেটি এবার আর হতে দেওয়া যাবে না। প্রতিটি টার্মিনালে মালিক-শ্রমিকের ক্ষমতা থাকতে হবে। প্রয়োজনে আরও লোক জোগাড় করে ওইদিন টার্মিনালগুলোতে পাহারা দিতে হবে। সেদিন অবশ্যই বাস অন রোড রাখতে হবে।’
১০ ডিসেম্বর গাড়ি চলাচল যাতে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় সেজন্য শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান এনায়েত উল্ল্যাহ।
সভায় আলোচনার বিষয় ও সিদ্ধান্ত জানিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘বৈঠকে আমরা সবার কথা শুনেছি। আমরা পরিবহন মালিকদের আশ্বস্ত করেছি। সবাইকে রাতে সব গাড়ি একসঙ্গে রাখার পরামর্শ দিয়েছি। সেখানে যেন সবাই রাত-দিন পাহারার ব্যবস্থা করেন। যাত্রী নাই বলে রাস্তা থেকে গাড়ি বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। তাই সবাইকে ওইদিন গাড়ি সচল রাখার আহ্বান জানিয়েছি।’
একইসঙ্গে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের সবার কাছে যাত্রী ও পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানাই।