Tuesday 30 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জাতীয় নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সম্প্রীতিতে বাংলাদেশের আপসহীন অবস্থান

সাইফুল ইসলাম শান্ত
৩০ জুন ২০২৬ ১৭:৪৩

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি অনন্য রাষ্ট্র। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করা এই দেশটি নানা চ্যালেঞ্জ, সংকট এবং আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে ধারণ করে রেখেছে—বাংলাদেশে নাগরিক পরিচয়ই সর্বাগ্রে, ধর্মীয় পরিচয় নয়। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই রাষ্ট্র আজও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, জাতীয় ঐক্য এবং নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে চলেছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, পার্বত্য অঞ্চল কিংবা নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা সামনে এসেছে। গণতান্ত্রিক বিশ্বে সমালোচনা এবং বিশ্লেষণ স্বাভাবিক। তবে কোনো রাষ্ট্রের বাস্তবতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, অভিযোগ বা একতরফা বয়ানের পরিবর্তে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো— এটি এমন একটি দেশ, যেখানে ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় নীতির অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা হয় এবং এই দুই প্রশ্নে রাষ্ট্র কোনো আপস করে না।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মর্যাদা এবং সমঅধিকারের আদর্শ নিয়ে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রটির সংবিধান নাগরিকদের ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলা হয়েছে এবং ৪১ অনুচ্ছেদে ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে একজন নাগরিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি বাংলাদেশি। এই দেশের সামাজিক বাস্তবতাও সেই দর্শনের প্রতিফলন। ঈদে যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তেমনি দুর্গাপূজা, বড়দিন বা বুদ্ধ পূর্ণিমায় মুসলিমদের অংশগ্রহণও সাধারণ দৃশ্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই পাড়ায় মসজিদ, মন্দির, গির্জা পাশাপাশি অবস্থান করছে। ধর্মীয় বৈচিত্র্যের এই সহাবস্থান আমাদের শতাব্দীব্যাপী গড়ে ওঠা সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। তবে এটাও সত্য যে, বাংলাদেশের মতো জনবহুল এবং বৈচিত্র্যময় সমাজে বিচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, উসকানি বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ডের ফলে কোথাও কোথাও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্র কখনো এসব ঘটনার প্রতি নীরব সমর্থন দেয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত হস্তক্ষেপ করেছে, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে।

জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ়। বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা শুধু সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, সাইবার হামলা, মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং শরণার্থী সংকট—সবকিছুই এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। বাংলাদেশকে একই সঙ্গে এসব বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। ২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা থেকে শুরু করে ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলা পর্যন্ত একাধিক ঘটনা রাষ্ট্রকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কঠোর এবং সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, ধর্মীয় নেতা এবং নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। র‌্যাব, পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার ধারাবাহিক অভিযানে বড় বড় জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। শুধু অভিযান নয়, তরুণদের উগ্রবাদ থেকে দূরে রাখতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো হয়েছে। দেশের আলেম-ওলামারা স্পষ্ট ভাষায় জঙ্গিবাদকে ইসলামের পরিপন্থী ঘোষণা করেছেন।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হলো তার সশস্ত্র বাহিনী। সেনাবাহিনী শুধু দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নয়, দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে বিশ্বের শীর্ষ অবদানকারী দেশগুলোর একটি। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জন করেছেন। কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, লেবানন, মালি কিংবা সাইপ্রাস—যেখানেই বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা গেছেন, সেখানেই তারা শুধু সামরিক দায়িত্ব পালন করেননি স্থানীয় জনগণের জন্য চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানবিক সহায়তাও দিয়েছেন। তাদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং মানবিক আচরণ জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রশংসিত হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী শুধু দেশের ভেতরে নয়, বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশের মানবিক অবস্থানের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো রোহিঙ্গা সংকট। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজার এবং ভাসানচরে অবস্থান করছে। বিশ্বের অনেক দেশ সীমান্ত বন্ধ করে দিলেও বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব থেকে পিছু হটেনি। এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং নিরাপত্তার ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। তবুও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। একই সঙ্গে সরকার স্পষ্টভাবে বলে এসেছে যে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে। সীমান্ত নিরাপত্তাও বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, পাহাড়ি অঞ্চল, নদীপথ এবং উপকূলীয় এলাকা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জটিল করে তোলে। মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র পরিবহন এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি নিয়মিত কাজ করছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামও দীর্ঘদিন ধরে একটি সংবেদনশীল অঞ্চল। সেখানে উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও এখনও কিছু বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা বাহিনীকে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হয়।

জাতীয় নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। একটি রাষ্ট্র তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন তার জনগণ কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং উন্নয়নের সুযোগ পায়। গত দুই দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি উৎপাদন, পোশাকশিল্প, ডিজিটাল সেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও শক্তিশালী করেছে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও নিরাপদ এবং সম্প্রীতিময় রাখতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থায় নাগরিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় নেতাদের সম্প্রীতি ও শান্তির বার্তা প্রচারে আরও সম্পৃক্ত করা দরকার। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ঘৃণামূলক প্রচারণা মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত ও আইনি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—বাংলাদেশের শক্তি তার জনগণের মধ্যে নিহিত। এই দেশের মানুষ ইতিহাসের নানা সংকটে প্রমাণ করেছে যে তারা বিভাজনের চেয়ে ঐক্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ধর্মীয় পরিচয়ের আগে নাগরিক পরিচয়কে মূল্য দেওয়া, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে দাঁড়ানোই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

বাংলাদেশ ছোট্ট রাষ্ট্র হলেও এই জাতি প্রমাণ করেছে যে, ভৌগোলিক আয়তন বা সামরিক শক্তি দিয়ে না একটি জাতির সত্যিকারের শক্তি নিহিত থাকে তার মূল্যবোধে, তার ঐক্যে এবং তার নাগরিকদের পারস্পরিক আস্থায়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য, নাগরিক পরিচয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার রাষ্ট্রীয় নীতি, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষায় গৌরবজনক অবদান, জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর সংকল্প এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিটি মাত্রায় সজাগ দৃষ্টি — এই সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ একটি আত্মবিশ্বাসী ও শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। জাতীয় ও ধর্মীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশ অতীতে যেমন এক বিন্দুও ছাড় দেয়নি, ভবিষ্যতেও দেবে না আশা করি। কারণ এই দুটি বিষয় শুধু রাষ্ট্রীয় নীতির প্রশ্ন নয় এটি এই মাটির মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন, তাদের পরিচয়ের প্রশ্ন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট