মানুষের মনকে জানার পরিধি যেমন বাড়ায়, তেমনই সৃষ্টিজগতের রূপ-রস উপভোগ করে স্রষ্টার মহত্ত্ব অনুভবের সুযোগ করে দেয় সফর বা ভ্রমণ। ইসলামে সৎ নিয়তে ভ্রমণ করা কেবল ঘুরে বেড়ানো নয়, বরং এটি ইবাদতেরই একটি অংশ। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে সুরক্ষায় থাকা এবং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দিষ্ট কিছু দোয়া ও আমল শিখিয়ে গেছেন। মহানবীর (সা.) হাদিসের আলোকে সফরের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি দোয়া ও আমল নিচে তুলে ধরা হলো…
সফরে বের হওয়ার আগে দুই রাকাত নামাজ
ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সফরের নিয়তে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া মুস্তাহাব। মহানবী (সা.) বলেছেন, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দুই রাকাত নামাজ পড়লে আল্লাহ তাআলা সফরকারীকে যাবতীয় অকল্যাণ থেকে রক্ষা করেন (মুসনাদে বাজ্জার)।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার দোয়া
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পড়ার দোয়া…
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহর নামে বের হচ্ছি, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া পাপ থেকে বাঁচার এবং সৎকাজ করার কোনো শক্তি নেই (সুনানে তিরমিজি)।
যানবাহনে ওঠার দোয়া
বাহনে আরোহণ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দোয়াটি পাঠ করতেন…
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা, ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনিন। ওয়া ইন্না ইলা রব্বিনা লামুনকালিবুন।
অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি এই বাহনকে আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন; অথচ আমরা এটিকে বশে আনতে সক্ষম ছিলাম না। আর নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রবের কাছেই ফিরে যাব (সহিহ মুসলিম)।
নিরাপদ সফরের মূল দোয়া
সফরে রওয়ানা হয়ে এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত…
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফি সাফারিনা হাজাল বিররা ওয়াত তাকওয়া, ওয়া মিনাল আমালি মা তারদা। আল্লাহুম্মা হাওয়ািন আলাইনা সাফারানা হাজা, ওয়াতউই আন্না বুদআহু। আল্লাহুম্মা আনতাস সাহিবু ফিস সাফারি ওয়াল খলিফাতু ফিল আহলি। আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিন ওয়াসআসিস সফর, ওয়া কাবাতিল মানজার, ওয়া সুইল মুনকালাবি ফিল মালি ওয়াল আহলি।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমরা আমাদের এই সফরে আপনার কাছে পুণ্য, তাকওয়া এবং আপনার সন্তোষজনক আমল প্রার্থনা করছি। আমাদের সফরকে সহজ ও দূরত্বকে সংক্ষিপ্ত করে দিন। আপনিই সফরে আমাদের সঙ্গী এবং পরিবারের অভিভাবক। সফরের কষ্ট, দুঃখজনক দৃশ্য এবং সম্পদ ও পরিবারের অকল্যাণকর পরিণতি থেকে আপনার আশ্রয় চাই (সহিহ মুসলিম)।
নতুন শহর বা লোকালয়ে প্রবেশের দোয়া
কোনো জনপদে প্রবেশের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন…
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রব্বাস সামাওয়াতিস সাবই ওয়া মা আজলালনা, ওয়া রব্বাল আরাদিনাস সাবই ওয়া মা আকলালনা, ওয়া রব্বাশ শায়াতিনি ওয়া মা আদলালনা, ওয়া রব্বর রিয়াহি ওয়া মা জারাইনা। আসআলুকা খাইরা হাজিহিল কারিয়াতি ওয়া খাইরা আহলিহা, ওয়া খাইরা মা ফিহা। ওয়া আউজুবিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি আহলিহা, ওয়া শাররি মা ফিহা।
অর্থ: হে আল্লাহ, সাত আসমান, সাত জমিন, শয়তান এবং বাতাসের রব! আমি আপনার কাছে এই জনপদ, এর অধিবাসী ও এতে বিদ্যমান সব কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং এর সব অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই (সুনানে নাসায়ি)।
গন্তব্যে অবস্থানের দোয়া
হোটেল বা সাময়িক অবস্থানে নিরাপত্তার জন্য পড়ার দোয়া…
উচ্চারণ: আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক।
অর্থ: আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর অসিলায় আমি তার সৃষ্টির সব অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই। (রাসুল সা. বলেছেন, এটি পাঠ করলে স্থান ত্যাগ করা পর্যন্ত কোনো কিছু ক্ষতি করতে পারবে না—সহিহ মুসলিম)।
বিপদগ্রস্ত বা অসুস্থ ব্যক্তি দেখলে দোয়া
সফরে কোনো অসুস্থ বা বিপদে পড়া মানুষকে দেখলে এই দোয়া পড়তে হয়…
উচ্চারণ: আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আফানি মিম্মাবতালাকা বিহি, ওয়া ফাদ্দালানি আলা কাছিরিম মিম্মান খালাকা তাফদিলা।
অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আপনাকে আক্রান্ত করা পরীক্ষা থেকে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তার অনেক সৃষ্টির ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন (সুনানে ইবনে মাজাহ)।
সফরের সংকটে ইস্তিগফার
সফরে কোনো বাধা বা পরীক্ষার মুখোমুখি হলে বেশি বেশি ইস্তিগফার করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়ে, আল্লাহ তাকে সব দুশ্চিন্তা ও সংকট থেকে মুক্তির পথ দেখান এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করেন (মুসনাদে আহমদ)।
বাড়ি ফেরার সময় দোয়া
সফর শেষ করে ফেরার পথে মূল সফরের দোয়ার পাশাপাশি এটি পাঠ করা মুস্তাহাব:
উচ্চারণ: আয়িবুনা, তায়িবুনা, আবিদুনা, লিরব্বিনা হামিদুন।
অর্থ: আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, আমাদের রবের ইবাদতকারী এবং তার প্রশংসাকারী (সহিহ মুসলিম)।
সফর শেষে ঘরে ফিরে নামাজ
সফর শেষে নিজ এলাকায় ফিরে প্রথমে মসজিদে অথবা ঘরে ঢুকে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রিয় সুন্নাত।
সফরকে আনন্দদায়ক, কষ্টমুক্ত ও বরকতময় করতে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর শেখানো এই আমলগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। চলার পথে প্রতি পদে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করা এবং তার প্রতি পূর্ণ ভরসা রাখাই একজন মুমিনের আসল পরিচয়। সফর শুরু করা থেকে শুরু করে ঘরে ফেরা পর্যন্ত এই দোয়াগুলো নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আমরা যেমন সুন্নাতের অনুসরণ করতে পারি, তেমনই লাভ করতে পারি মহান আল্লাহর অশেষ নিরাপত্তা ও রহমত।