একই পরিবারে দাদা, বাবা আর নাতি – এই তিন প্রজন্মকে একসঙ্গে একই ছাদের নিচে দেখতে পাওয়াটাই বর্তমান আধুনিক যুগে বেশ আনন্দের বিষয়। অনেক পরিবারে হয়তো ভাগ্যক্রমে চার কিংবা পাঁচ প্রজন্মও ছোঁয়া যায়। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, আপনার পরিবারের একটি পারিবারিক ছবিতে একই বংশের টানা সাতটি প্রজন্ম পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলছে? শুনে কোনো দূর রূপকথার কল্পকাহিনি মনে হলেও ১৯৮৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘটেছিল এমন এক মাথা নষ্ট করা ঐতিহাসিক ঘটনা। বিশ্বখ্যাত গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতায় এটিই এখন পর্যন্ত কোনো একক পরিবারে একই সময়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক জীবিত প্রজন্মের স্বীকৃত বিশ্ব রেকর্ড। একই রক্ত আর একই বংশধারার প্রবীণ থেকে সদ্যোজাত শিশুদের এই মিলনমেলা দেখে সেদিন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল পুরো বিশ্ব।
১০৯ বছরের বৃদ্ধা ও ১ মাসের সদ্যোজাত শিশুর রক্তের বন্ধন
এই ঐতিহাসিক পরিবারের মূল কেন্দ্রবিন্দু ও সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অগাস্টা বুঙ্গে নামের এক প্রবীণ নারী। ১৯৮৯ সালের ২১ জানুয়ারি যখন তার ষষ্ঠ অধস্তন বংশধর অর্থাৎ প্রপৌত্রেরও পরের প্রজন্মের ক্রিস্টোফার জন বলিগের জন্ম হয়, তখন অগাস্টা বুঙ্গের বয়স ছিল ১০৯ বছর ৯৭ দিন। অর্থাৎ শতবর্ষী এই নারী জীবিত থাকতেই দেখে যেতে পেরেছেন তার বংশের সপ্তম প্রজন্মকে! নতুন এই শিশুর জন্ম মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবারটিকে বিশ্ব দরবারে ইতিহাস গড়ে দেয়। একদিকে এক শতকেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর নানা রূপ পরিবর্তন দেখা এক নারী, আর অন্যদিকে জীবনের প্রথম মাসে পা রাখা এক অবুঝ শিশু, তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল রক্তের এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘ পারিবারিক সেতুবন্ধন।
১০৯ থেকে ১৫ বছর: বয়সের অনন্য সমীকরণ ও সম্পর্কের হিসাব
গিনেস বুকে নাম ওঠা সেই ঐতিহাসিক ছবিতে যখন সাত প্রজন্ম একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল, তখন তাদের বয়সের ব্যবধান ও সম্পর্ক ছিল বিস্ময়কর। পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ক্রিস্টোফার জন বলিগের বয়স ছিল মাত্র এক মাস। আর বাকি ছয় প্রজন্মের বয়স ছিল যথাক্রমে ১৫ বছর, ৩৩ বছর, ৫২ বছর, ৭০ বছর, ৮৯ বছর এবং পরিবারের প্রধান অগাস্টা বুঙ্গের বয়স ছিল ১০৯ বছর। অর্থাৎ অগাস্টার মেয়ে, নাতনি, প্রপৌত্রী থেকে শুরু করে পরবর্তী আরও তিন প্রজন্মের সদস্যরা একই সময়ে একই পৃথিবীতে শ্বাস নিচ্ছিলেন। পরিবারের প্রতিটি সদস্য অল্প বয়সে সন্তান ধারণ করার ফলেই এবং অগাস্টার দীর্ঘায়ুর কারণে এমন এক অলৌকিক পারিবারিক সমীকরণ মেলা সম্ভব হয়েছিল, যা মানব ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
সময়ের দীর্ঘ সেতুবন্ধন এবং গিনেস রেকর্ডের চিরন্তন দলিল
ছবিটি কেবল গিনেস বুকের পাতায় একটি রেকর্ড বা সাধারণ ছবি হয়ে থাকেনি, এটি ছিল মানব জীবনের এক অপরূপ প্রতিচ্ছবি ও জীবন্ত স্মারক। একটিমাত্র ক্যামেরার ফ্রেমে শত বছরের ইতিহাস এবং ভালোবাসার এক সুদৃঢ় বন্ধন বন্দি হয়েছিল। একদিকে ১৯ শতকের শেষভাগে জন্ম নেওয়া এক নারী, আর অন্যদিকে ২০ শতকের শেষের দিকে জন্ম নেওয়া তার বংশধর, তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল বংশানুক্রমের পাঁচটি রক্তসম্পর্কিত স্তম্ভ। কালের পরিক্রমায় সেই প্রবীণ সদস্যরা আজ আর বেঁচে না থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সেই বুঙ্গে পরিবারের তোলা ছবির রেকর্ডটি আজও বিশ্ব জুড়ে দীর্ঘায়ু ও পারিবারিক সম্পর্কের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে অমর হয়ে আছে।