Thursday 01 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

চাহিদার চেয়ে কম বরাদ্দ দেওয়াতেই সারের সংকট!

এমদাদুল হক তুহিন সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৫:৪৩ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৭:২০

ঢাকা: সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার বিক্রি হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না কৃষক। ডিলাররা বলছেন, চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ দেওয়ায় দেশের কোথাও কোথাও সাময়িক সময়ের জন্যে সারের সংকট দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাব ডিলাররা সারের দাম বেশি রাখছেন। আবার ডিলারের কাছ থেকে কিনে নিয়ে কেউ কেউ বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। তবে সরকার বলছে, দেশের কোথাও সারের সংকট নেই। বাড়তি দামে সার বিক্রিরও কোনো সুযোগ নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বেনজীর আলম সারাবাংলাকে বলেন, ডিলারদের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হলে তাদের বেশি লাভ। যতো বিক্রি করতে পারবে তাদের লাভ ততো বেশি। সেজন্য তারা সব সময় বলে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের বার্ষিক বরাদ্দ নির্ধারণ করা আছে। মাসিক বরাদ্দের পরিকল্পনাও আছে। ঠিক যতোটুকু বরাদ্দ প্রয়োজন আমরা ততোটুকই দিচ্ছি।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘বরাদ্দ কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোথাও সারের কোনো ঘাটতি নেই। হয়তো ডিলারের কাছে সার যেতে কোনো কারণে এক দুই দিন দেরি হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘কোথাও সার এক পয়সাও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে না। অনেকে হয়তো বাকিতে সার কিনছে। সেখানে দোকানদার দাম কতো লিখছে সেটা তো আমরা দেখতে পারি না। হয়তো এমন সব ক্ষেত্রে দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে।’

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) চেয়ারম্যান কামরুল আশরাফ খান পোটন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সারের বরাদ্দ নির্ধারণ করে উপজেলা কৃষি অফিসাররা। সেই চাহিদাপত্র তারা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে পাঠায়। সেখান থেকে চূড়ান্ত বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়। দেখা যায়, এক জায়গায় বরাদ্দ হয়েছে ৪ হাজার টন, সেখানে চাহিদা রয়েছে ৮ হাজার টনের। সে কারণে এখন বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে সার নিয়ে সমস্যা হয়েছে সেখানেই বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। সার নিয়ে কোন সংকট নেই। সরকারের হাতে প্রচুর সার রয়েছে।’

কেজিতে ৬ টাকা বাড়ল ইউরিয়া সারের দাম

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাদের যারা ডিলার তারা জবাবদিহিতার আওতায় রয়েছে। তবে সাব ডিলার ও বিএডিসির ডিলাররা অনেক সময় বাড়তি দামে সার বিক্রি করছে। আবার অনেক যায়গায় প্যানিকের কারণে এমনটি হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘জামালপুরের ক্ষেত্রে যেটি ঘটেছে সেটি হচ্ছে, সেখানে সার ছিল না এমন নয়। জামালপুরের ডিলারকে টাঙ্গাইল থেকে সার নিতে বলা হয়েছিল। যে কারণে তিনি সার নিতে বিলম্ব করেন। অনেক ক্ষেত্রেই ডিলারদের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে সার আনতে বলা হয়। এক্ষেত্রে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে ডিলার সার আনতে বিলম্ব করে। যে কারণে সাময়িক সময়ের জন্য সার নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়।’

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি রিয়াজ উদ্দীন সারাবাংলাকে বলেন, ‘দেশের কোনো কোনো জেলার কোনো কোনো উপজেলায় চাহিদার চেয়ে ইউরিয়া সারের বরাদ্দ কম দেওয়া হয়। কোনো উপজেলায় ২০০ টন চাহিদা থাকলে হয়তো ১৭৫ টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এমন কারণেই সারের সংকট দেখা দিয়েছে। আমরা সেসব জেলা বা উপজেলায় দ্রুত বরাদ্দ বাড়ানোর অনুরোধ করেছি।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ডিলার পর্যায়ে সারের দাম বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। সাব ডিলাররা হয়তো কিছুটা বেশি নিচ্ছে। কারণ পরিবহন খরচ এর মধ্যে তারা যুক্ত করে।’

খুলনার ডিলার নাসির সারাবাংলাকে বলেন, ‘সারের সংকট নেই। তবে সার নিয়ে এক ধরণের প্যানিক সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকরা প্যানিকে পড়ে সার বেশি হারে কিনছে। ডিলার ও সাব ডিলারদের বেশি দামে সার বিক্রি করার সুযোগ নেই। ডিলার ও সাব ডিলার ছাড়াও ছোট দোকানিরা ১ থেকে ২ বস্তা নিয়ে হয়তো ৫ কেজি করে বিক্রি করছে। তারা হয়তো দাম বেশি রাখছে।’

লক্ষ্মীপুরের ডিলার ফারুক সারাবাংলাকে বলেন, ‘সারের বরাদ্দ নিয়ে জটিলতা আছে। এমওপি সারের বরাদ্দ কম। আমি বরাদ্দের বিপরীতে ডিও করেছিলাম গত মাসের ৩ তারিখ। বরাদ্দের সার পেয়েছি এই মাসের ১ তারিখ। ফেনী গুদামে সার না থাকায় দাউদকান্দি গুদাম থেকে সার দিয়েছে। লক্ষ্মীপুরে এই মৌসুমে সারের তেমন চাহিদা থাকে না। তবে সব ধরনের সারের বরাদ্দ নিয়েই জটিলতা রয়েছে। চাহিদার তুলনায় ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া দুই ধরনের সারই কম পাওয়া যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা যে ধরণের বরাদ্দের চাহিদাপত্র দেই সেখান থেকে কাটছাঁট করা হয়, এবারও হয়েছে। তবে গতবারের চেয়ে বরাদ্দ কম দিয়েছে এমন নয়। কিন্তু আমাদের মনে হচ্ছে কৃষক এখন সার বেশি ব্যবহার করছে। এখন বাগান, শাক সবজিসহ নানা জায়গায় সারের ব্যবহার হচ্ছে। ফলে মাঠপর্যায়ে সারের চাহিদাও বেশি।’

এক প্রশ্নের উত্তরে এই ডিলার বলেন, ‘আমাদের যাদের বাফার নেই, সার পরিবহনে তাদের খরচ বেশি। আবার ডিলারের দোকান থেকে সাব ডিলারের দোকানে সার নিতে বস্তা প্রতি খরচও বেড়ে যাচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতি বস্তার পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আবার সার খুচরাভাবে বিক্রি করলে পলিথিন লাগছে, সেই পলিথিনের খরচও এক টাকা। যার কারণে খুচরায় কেজিতে সারের বেশি দাম নিচ্ছে সাব ডিলাররা।’

নীলফামারীর ডিলার ওয়াহেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সব ধরণের সারের বরাদ্দ কম। আমরা যে চাহিদাপত্র দিচ্ছি, তার তুলনায় বরাদ্দ কম পাচ্ছি। তবে ডিলার পর্যায়ে সারের দাম কেউ বেশি নিচ্ছে না। খুচরা বিক্রেতারা বেশি দামে সার বিক্রি করছে। ডিলারের দোকান থেকে বাইরে নিয়ে সার বিক্রি করতে পারলেই বস্তাতে ২০০ টাকা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। প্যান্ট-শার্ট পড়া অনেক লোকও এখন সার কিনছে। পরে তার সেই সার খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে।’

ঢাকার জেলার সার ডিলার মো. আলাউদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘উত্তরবঙ্গে সারের ক্রাইসিস রয়েছে। এ কারণে সারা দেশেই তদারকি শুরু করেছে সরকার। ঢাকা জেলায় কোনো সমস্যা নেই। আমরা যে চাহিদাপত্র দেই, তার ৫০ শতাংশ বরাদ্দ দিতে পারে সরকার। সেটা দিয়েই মোটামুটি কাভার করা যায়। তবে উত্তরবঙ্গে আমনের আবাদ বেশি হওয়ায় সার নিয়ে কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে। ডিলার পর্যায়ে সারের দাম বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। খুচরায় সাব ডিলার ও বিএডিসির ডিলাররা হয়তো সারের দাম বেশি নিচ্ছে।’

এদিকে, জামালপুর, ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম, রংপুর, পাবনাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে সার সংকটের খবর পাওয়া গেছে। এসব জেলার কোথাও কোথাও ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা বস্তায় ইউরিয়া সার বিক্রি হয়েছে বলে কৃষকদের অভিযোগ। গত ৫ সেপ্টেম্বর জামালপুর সদর উপজেলায় চাহিদা অনুযায়ী সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ কয়েক’শ কৃষক। প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটেছে আরও কয়েকটি জেলায়।

ঝিনাইদহের কৃষক হাবিব বলেন, ‘আমরা কোনো সারই পাচ্ছি না। ইউরিয়া যদিও দু-এক বস্তা পাচ্ছি তাও দাম বেশি। ১৩০০-১৪০০ টাকা করে যে যা পাচ্ছে সেই দামে বিক্রি করছে। আর ফসফেট, পটাশ তো পাওয়ায় যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় আমরা ধানের আবাদ করবো কিভাবে। আগে জানলে আমরা ধানের আবাদ করতাম না।’

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার কৃষক মোস্তফা জানান, ইউরিয়া সার ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা বস্তায় কিনতে হচ্ছে। অন্য সারের দাম আরও বেশি। সরকার শুধু ইউরিয়ার দাম বাড়ালেও দোকানে সব ধরণের সারের দামই বেড়েছে।

এর আগে, আগস্টে ইউরিয়া সারের দাম বাড়িয়ে ৫০ কেজির বস্তা নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ১০০ টাকা। এছাড়া পটাশ সারের সরকার নির্ধারিত দাম ৬৫০ টাকা, টিএসপি এক হাজার টাকা ও ডিএপি ৭০০ টাকা বস্তা। সরকার নন ইউরিয়া সারের দাম না বাড়ালেও কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে এসব সারের দামও।

আরও পড়ুন:
সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে মিলছে না সার
আমদানিকারক ‘সিন্ডিকেটেও’ বেড়েছে সারের দাম!

সারাবাংলা/ইএইচটি/এমও
বিজ্ঞাপন

রাজকীয় স্বাদের ছানার কোপ্তা কারি
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৫৪

আরো

এমদাদুল হক তুহিন - আরো পড়ুন