শুভ কাজের শুরুতে পরম করুণাময়ের নাম স্মরণ করা কেবল একটি উত্তম অভ্যাসই নয়, বরং এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ। এ কারণে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, আহার গ্রহণ, গৃহে প্রবেশ, কোনো কিছু লেখা কিংবা বৈধ যেকোনো কাজের সূচনায় ‘বিসমিল্লাহ’ বলার নির্দেশনা রয়েছে।
আসুন জেনে নেই, কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণের অনন্য তাৎপর্য…
বিসমিল্লাহর অর্থ ও গভীরতা
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ শব্দের অর্থ, পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। এই পবিত্র বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমে একজন মানুষ মূলত নিজের অহংকার ও শক্তিকে দূরে সরিয়ে রেখে সর্বশক্তিমান আল্লাহর দয়া, সাহায্য ও তাওফিকের ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন।
শুরুর এই আমল কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কাজে কল্যাণ ও প্রাচুর্য লাভ: মহান আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করলে সেই কাজে বিশেষ রহমত ও বরকত নেমে আসে। পবিত্র কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ আয়াতেও মহান রব তাঁর নামে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে যেকোনো ভালো কাজের সূচনা তাঁর স্মরণের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
নেতিবাচক প্রভাব থেকে সুরক্ষা: এই আমলটি মানুষকে শয়তানের প্ররোচনা ও অনিষ্ট থেকে দূরে রাখে। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, কেউ যখন ঘরে প্রবেশ কিংবা আহারের সময় আল্লাহর নাম নেয়, তখন শয়তান সেখানে আশ্রয় বা খাবারের অংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত ও হতাশ হয়ে পড়ে।
অশুভ শক্তির দুর্বলতা: আল্লাহর নামের শক্তি এতটাই মহান যে, এটি শয়তানের প্রভাবকে পুরোপুরি স্তিমিত করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি নির্দেশনা থেকে জানা যায়, কোনো বিপত্তিতে শয়তানকে গালমন্দ না করে ‘বিসমিল্লাহ’ বললে সে অত্যন্ত দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
সাধারণ কাজও সওয়াবের মাধ্যম: একজন মুসলিম যখন তাঁর যেকোনো হালাল পেশা, পড়াশোনা, ব্যবসা কিংবা প্রাত্যহিক কাজ আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করেন, তখন সেই জাগতিক কাজটিও সওয়াব ও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
পূর্ণাঙ্গতার নিশ্চয়তা: ধর্মীয় দিকনির্দেশনা অনুযায়ী, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বা অর্থবহ কাজ যদি আল্লাহর নাম ছাড়া শুরু করা হয়, তবে তা বরকতহীন ও অপূর্ণ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কাজের সফলতা ও পূর্ণতার জন্য শুরুতেই আল্লাহর নাম নেওয়া জরুরি।
যেসব ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহ বলা নিয়ম
ইসলামী পরিভাষায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহ বলা বিশেষভাবে অনুসরণীয়…
যেকোনো খাবার ও পানীয় গ্রহণের শুরুতে।
পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবা ব্যতীত অন্য সব সুরার শুরুতে।
হালাল পশু জবাই করার সময়।
ওজু শুরু করার প্রাক্কালে।
বাসস্থান বা ঘরে প্রবেশের মুহূর্তে।
কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিঠি, আবেদন বা প্রবন্ধ লেখার শুরুতে।
‘৭৮৬’ কি বিসমিল্লাহর সমকক্ষ?
আমাদের সমাজে অনেক সময় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লেখার পরিবর্তে সংক্ষেপে ‘৭৮৬’ সংখ্যাটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে ইসলামি শরিয়াহ ও বিশুদ্ধ হাদিসের কোথাও এই সংখ্যাটিকে বিসমিল্লাহর বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাই সংখ্যার আশ্রয় না নিয়ে সরাসরি পবিত্র বাক্যটি উচ্চারণ করা বা লেখাই সুন্নাহর সঠিক নিয়ম।
পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা
যেহেতু ‘বিসমিল্লাহ’ পবিত্র কোরআনের একটি সম্মানিত অংশ, তাই এর অবমাননা রোধে সতর্ক থাকা আবশ্যক। যেসব কাগজ, লিফলেট বা পোস্টার পরবর্তীতে অবহেলায় মাটিতে পড়ে যাওয়ার বা ময়লাযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেগুলোতে এটি না লেখাই শ্রেয়। এমন পরিস্থিতিতে কাগজে না লিখে মুখে উচ্চারণ করে কাজটি শুরু করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
আমাদের পথচলা হোক আল্লাহর নামে
যেকোনো বৈধ কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করা একজন মুমিনের বিনয় ও তাওয়াক্কুলের বহিঃপ্রকাশ। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় হালাল কাজে ‘বিসমিল্লাহ’ বলার অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনকে আল্লাহর রহমত ও বরকতে সিক্ত করতে পারি।