Tuesday 07 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রথম নারী বিচারপতি সান্দ্রা ডে ও’কনর

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৭ জুলাই ২০২৬ ১৫:২৭ | আপডেট: ৭ জুলাই ২০২৬ ১৫:৩২

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ইতিহাসে ১৯৮১ সালের ৭ জুলােই ছিল একটি মাইলফলক। দীর্ঘ দুইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা পুরুষতান্ত্রিক বলয় ভেঙে সেই বছর দেশটির সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টে প্রথম নারী বিচারপতি হিসেবে পা রাখেন সান্দ্রা ডে ও’কনর। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এই অনন্য মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ও’কনরের এই নিয়োগ কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না, বরং তা ছিল সমগ্র মার্কিন সমাজ ও বিচারব্যবস্থার লিঙ্গবৈষম্য দূর করার এক শক্তিশালী পদক্ষেপ। তৎকালীন সময়ে এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এটি শীর্ষ সংবাদ হিসেবে স্থান পায়।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও যোগ্য নারী প্রার্থীর সন্ধান

প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান তার ১৯৮০ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় মার্কিন জনগণের কাছে একটি বিশেষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, সুযোগ পেলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে প্রথম কোনো নারী বিচারপতি নিয়োগ করবেন। ১৯৮১ সালে সুপ্রিম কোর্টের সহযোগী বিচারপতি পটার স্টুয়ার্টের আকস্মিক অবসরের ঘোষণার পর রেগান তার সেই ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি পূরণের সুবর্ণ সুযোগ পান। তিনি তার প্রশাসনকে নির্দেশ দেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও যোগ্য একজন নারী আইনি ব্যক্তিত্বকে খুঁজে বের করতে। আইনি জগতে নারীদের পদচারণা তখন আজকের মতো সহজ ছিল না, ফলে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে নেওয়া ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ।

সান্দ্রা ডে ও’কনরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও সংগ্রাম

অ্যারিজোনার এক প্রত্যন্ত গবাদি পশুর খামারে বেড়ে ওঠা সান্দ্রা ডে ও’কনর ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি বিশ্ববিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড ল স্কুল থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই সময়ে শীর্ষস্থানীয় ফলাফল করার পরেও কেবল নারী হওয়ার কারণে অন্তত ৪০টি বড় ল ফার্ম তাকে আইনজীবী হিসেবে চাকরি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরিস্থিতির শিকার হয়ে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সান মাতেও কাউন্টিতে কোনো বেতন ছাড়াই প্রথম কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে অ্যারিজোনা রাজ্যের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হন এবং অ্যারিজোনা স্টেট সিনেটের প্রথম নারী মেজরিটি লিডার বা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত হন। সুপ্রিম কোর্টে মনোনীত হওয়ার আগে তিনি অ্যারিজোনা কোর্ট অব আপিল-এর বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ঐতিহাসিক সেই হোয়াইট হাউসের ঘোষণা

১৯৮১ সালের জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান আনুষ্ঠানিকভাবে সান্দ্রা ডে ও’কনরকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে মনোনীত করার ঘোষণা দেন। হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এই ঘোষণাটি আমেরিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বিশাল বিস্ফোরণের মতো ছিল। রেগান তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে তিনি ও’কনরকে ফোন করে মনোনয়নের বিষয়টি জানানোর সময় অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরের কেউ কেউ এই মনোনয়নের বিরোধিতা করলেও সাধারণ মানুষের কাছে এটি ছিল এক বিরাট সমাদৃত সিদ্ধান্ত।

সিনেটের সর্বসম্মত অনুমোদন ও নতুন যুগের সূচনা

মনোনয়ন পাওয়ার পর ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন সিনেটের জুডিশিয়ারি কমিটির সামনে ও’কনরকে হাজির হতে হয়। এটিই ছিল মার্কিন ইতিহাসে প্রথম কোনো সুপ্রিম কোর্ট প্রার্থীর টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হওয়া শুনানি। শুনানিতে ও’কনর তার গভীর আইনি জ্ঞান, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় পক্ষের সিনেটরদের মুগ্ধ করেন। যার ফলশ্রুতিতে, ২১ সেপ্টেম্বর মার্কিন সিনেটে ৯৯-০ ভোটের এক অভূতপূর্ব ব্যবধানে তার নিয়োগ চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়। একজন বিরোধী সিনেটরও তার বিরুদ্ধে ভোট দেননি, যা আমেরিকার ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

সুপ্রিম কোর্টে ও’কনরের প্রভাব ও যুগান্তকারী ভূমিকা

বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সান্দ্রা ডে ও’কনর সুপ্রিম কোর্টে টানা ২৪ বছর অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করেন। তিনি আদালতের কোনো চরমপন্থী ধারার সাথে গা ভাসিয়ে না দিয়ে একজন মধ্যপন্থী ও বাস্তববাদী বিচারক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। অনেক জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তার ভোটটিই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয় নির্ধারণকারী বা ‘সুইং ভোট’ হিসেবে কাজ করত। লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিকার রক্ষা এবং নাগরিক স্বাধীনতা সংক্রান্ত অসংখ্য মামলার রায়ে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। ২০০৬ সালে তিনি তার অসুস্থ স্বামীর পরিচর্যা করার জন্য স্বেচ্ছায় এই পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ও’কনরের এই পথচলা আমেরিকার কোটি কোটি নারীর জন্য আইনি পেশায় আসার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর