Wednesday 30 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / যেভাবে ‘বাংলা ব্লকেড’ কাঁপিয়ে দিয়েছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইল

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৭ জুলাই ২০২৬ ০৮:১৩ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ ২৩:৪০

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: দুপুরের তপ্ত রোদ তখন ঢাকার পিচঢালা রাস্তায় অগ্নিস্ফূলিঙ্গ ছড়াচ্ছে। ঠিক তখনই শাহবাগ মোড়ের চারপাশ থেকে ধেয়ে এলো হাজার হাজার তরুণের এক অভূতপূর্ব জোয়ার। কোনো লাঠি নেই, অস্ত্র নেই; অথচ তাদের স্লোগানের প্রতিটি শব্দে কেঁপে উঠছিল শাসকের রাজপ্রাসাদ।

৭ জুলাই ২০২৪। ঘড়ির কাঁটায় যখন বিকেল সাড়ে তিনটে। ঠিক তখনই চারপাশের চাকা থমকে গেল। অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া আর কোনো গাড়ির ইঞ্জিন সচল রইল না। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ রিকশাচালক কপালে হাত ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, ‘আইজকা পোলাপাইন ইতিহাস বানাইতাছে!’ পলকেই পুরো দেশ থমকে গেল, রচিত হলো এক নতুন প্রতিরোধ, যার নাম ‘বাংলা ব্লকেড’। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া চার দফা আন্দোলনের মোড় ঘুরে সেদিনই দেশের ছাত্রসমাজ জানিয়ে দিয়েছিল, এবার লড়াই কেবল এক দফার; বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার।

বিজ্ঞাপন

শাহবাগের সেই অগ্নিঝরা বিকেল ও এক দফার হুঙ্কার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে দুপুর নামার আগেই জমতে শুরু করেছিল ক্ষোভের বারুদ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শয়ে শয়ে শিক্ষার্থী রূপ নিল জনসমুদ্রে। সেখান থেকে মিছিল যখন নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাব আর চানখাঁরপুল ছুঁয়ে শাহবাগ মোড়ে এসে আছড়ে পড়ল, তখন চারপাশের বাতাস ‘কোটা না মেধা? মেধা মেধা!’ স্লোগানে ভারী হয়ে উঠেছে। মাইকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। স্পষ্ট এবং আপসহীন কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘সরকার দাবি না মানলে আমরা আর ক্লাসে ফিরছি না।’ চার ঘণ্টার সেই অবরুদ্ধ শাহবাগ কেবল ঢাকাকেই অচল করেনি, বরং তৎকালীন সরকারকে এক চরম বার্তা দিয়েছিল।

সেই সন্ধ্যাতেই আন্দোলনের রূপরেখা বদলে যায়। চার দফা দাবি সংকুচিত হয়ে এক দফায় রূপ নেয়, সব গ্রেডে অযৌক্তিক কোটা বাতিল করে সংসদে আইন পাস করতে হবে। সরকারের একদল প্রতিনিধি গোপনে আলোচনার টেবিলে বসার আমন্ত্রণ জানালেও শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনড় থেকে রাজপথ ছাড়েনি, যা এই আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট।

অবরুদ্ধ রাজধানী ও অচল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া

ঢাকা শুধু একটা শহর ছিল না সেদিন, ঢাকা ছিল পুরো দেশের প্রতিবাদের রাজধানী। নীলক্ষেতে ইডেন কলেজের ছাত্রীরা, সায়েন্স ল্যাবে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা, আর আগারগাঁওয়ে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা যখন রাস্তায় আড়াআড়ি শুয়ে পড়লেন, তখন পুরো ঢাকা এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হলো। ফাঁকা পিচঢালা রাস্তায় কোথাও যুবকেরা মেতে উঠলেন ফুটবলে, কোথাও ক্রিকেট ব্যাটের ঠোকাঠুকিতে কেটে গেল পুরো দুপুর। কিন্তু এই প্রতিরোধ শুধু ঢাকার চার দেয়ালে বন্দি ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে ‘বাংলা ব্লকেড’ ছড়িয়ে পড়ল দেশের প্রতিটি মহাসড়কে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক আটকে দিলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কে ব্যারিকেড তুললেন, আর বরিশাল থেকে দিনাজপুর তীব্র বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে এলেন। চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে কোথাও পুলিশি বাধা, কোথাও বা প্রশাসনের নীরব চশমা পরা চোখের সামনেই তৈরি হলো এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে গেলেও মানুষের মনের যোগাযোগের পথটা সেদিন আরও প্রশস্ত হয়েছিল।

প্রতিরোধ হয়ে উঠল সুর, কবিতা আর সামাজিক মেলবন্ধন

এই আন্দোলনের সবচেয়ে সুন্দর এবং শক্তিশালী দিক ছিল এর সাংস্কৃতিক রূপ। এটি কেবল ভাঙচুর বা মারামারির প্রথাগত কোনো আন্দোলন ছিল না। শাহবাগ থেকে শুরু করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর পর্যন্ত সর্বত্রই তরুণরা গান, কবিতা আর পথনাটকের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ‘কারার ওই লৌহকপাট’ কিংবা ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর’ গানগুলো নতুন আঙ্গিকে গেয়ে উঠছিল তরুণ বুকগুলো।

সবচেয়ে অবাক করা দৃশ্য ছিল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থেকেও কোনো চালক কিংবা যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। উল্টো রিকশাচালক, ফুটপাতের দোকানি আর সাধারণ পথচারীরা নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন পানির বোতল আর বিস্কুটের প্যাকেট। স্কুলপড়ুয়া সন্তানকে হাত ধরে মিছিলে নিয়ে এসেছিলেন অনেক বাবা-মা। এটি আর কেবল ছাত্রদের চাকরি পাওয়ার আন্দোলন ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের এক বিশাল সামাজিক গণপ্রতিরোধ, যেখানে আপামর জনতা এক সুতোয় গেঁথে গিয়েছিল।

ক্ষমতার দম্ভ ও ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন

গণভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন যুব মহিলা লীগের অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে তীব্র কটাক্ষ করে বললেন, ‘আন্দোলনের নামে লেখাপড়া বাদ দেওয়া যৌক্তিক নয়’ । তখনও তিনি হয়তো আঁচ করতে পারেননি এই তরুণদের ভেতরের বারুদের তীব্রতা কতটা বেশি। হাইকোর্টের রায় আর আইনি মারপ্যাঁচের অজুহাত দিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে মোড় নেওয়ার সব চেষ্টা সেদিন ব্যর্থ করে দিয়েছিল ছাত্রসমাজ। নাহিদ ইসলামের সেই অমোঘ আলটিমেটাম ‘দাবি মেনে নেন, না হয় ১০০ পারসেন্ট কোটা দিয়ে দেন, ঘোষণা করে দেন এটা কোটাধারীদের দেশ’ তৎকালীন স্বৈরাচারী ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।

৭ জুলাইয়ের ‘বাংলা ব্লকেড’ কেবল রাস্তাঘাট ব্লক করার কর্মসূচি ছিল না, এটি ছিল একটি ঘুমন্ত জাতির বিবেককে জাগিয়ে তোলার অবিনাশী মন্ত্র। রাষ্ট্র যখন নীরব থাকে, জনগণের কণ্ঠ যে তখন এভাবেই রাজপথে গর্জে ওঠে; ২০২৪ সালের জুলাইয়ের এই ঐতিহাসিক দিনটি তারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসে।

সারাবাংলা/এফএন/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

রাজকীয় স্বাদের ছানার কোপ্তা কারি
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৫৪

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর