ঢাকা: ঢোলের চাঁটি, খঞ্জরির ঝংকার আর মুক্তমঞ্চের চিরচেনা সেই মাটি-মানুষের গন্ধ। ইট-কাঠের ঢাকার বুক চিরে যেন এক নিমেষে হাজির হয়েছিল রাঢ় বাংলার মেঠো পথ আর অজয় নদের পার। উপলক্ষ্য জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টির লোকায়ত শিকড়কে ছুঁয়ে দেখা।
নজরুল বর্ষ উদযাপনের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করে এক বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ‘নজরুলের লেটোগান ও কবিগান’।
জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে দর্শক পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে সুর ও বাণীর এই লড়াই যেন উপস্থিত সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ১০০ বছর আগের সেই চুরুলিয়া গ্রামে, যেখানে দুখু মিয়া তার শৈশবের দুরন্তপনা মাখিয়ে ঘুরে বেড়াতেন লেটোদলের সঙ্গে।
সন্ধ্যা নামতেই মঞ্চে ধ্বনিত হয় জ্ঞান ও সুরের মেলবন্ধন। ‘কাজী নজরুল ইসলামের লেটোগান ও কবিগান: লোকঐতিহ্য, সৃজনশীলতা ও বিদ্রোহী চেতনার উৎসসন্ধান’ শীর্ষক সারগর্ভ প্রবন্ধ পাঠ করেন সরকারি সংগীত কলেজের লোকসংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কমল খালিদ।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) নজরুলের কৈশোরের এই অজানা দিগন্তটি দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন।
তিনি মনে করিয়ে দেন, মাত্র আট-দশ বছর বয়সেই লেটোদলে যুক্ত হতে গিয়ে কিশোর নজরুলকে পড়তে হয়েছে মহাভারত, বেদ কিংবা পবিত্র কুরআন। সেই অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতিই পরবর্তীতে তাকে বানিয়েছিল অনায়াসে গান ও কবিতা রচনার এক অনন্য কারিগর।

নজরুল বর্ষ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করে ‘নজরুলের লেটোগান ও কবিগান’। ছবি: সংগৃহীত
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানি এবং শিল্পকলা একাডেমির সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগের পরিচালক মেহবাজীন রহমান নজরুলের লোকজ সত্তাকে উদ্ভাসিত করার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান।
আলোচনার পরই শুরু হয় সেই কাঙ্ক্ষিত আলোড়নের পর্ব। ড. কমল খালিদের পরিচালনা ও রূপায়ণে মঞ্চে পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী লেটোগান ‘অন্ধরাজা’। সায়মা আহমেদ লিজার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ‘নিমশা লেটোদল’ ও ‘মেদেনীপুর লেটোদল’-এর কলাকুশলীদের নাটকীয় অভিনয়, গান আর কৌতুকরসে মিলনায়তনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে হাসির ফোয়ারা ও হাততালির ঝড়।
এর পরই জমে ওঠে আসর! শুরু হয় কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘কবির লড়াই’। জীবন চৌধুরীর পরিচালনা ও রূপায়ণে কবিয়াল জীবনউড়ের সঙ্গে গানে গানে বাক্যবাণে মেতে ওঠেন কবিয়াল গুমানী বাবু। সঙ্গে বাবুল হোসাইন ও মামুন হোসাইনের সহ-পরিবেশনা এবং শান, শ্যামলী, অনন্যাদের দোহারের তাল যেন দর্শককে বুঁদ করে রাখে। তবলা, বাঁশি আর ঢোলের যুগলবন্দিতে পুরো মিলনায়তন রূপান্তরিত হয় এক ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলায়।
দিনশেষে এই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা শুধু একটি আয়োজন হয়ে থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছিল নজরুলের লোকজ শিকড়ে ফেরার এক অপূর্ব মাধ্যম। যেখানে বাংলার মাটি, হাসি- কান্না, প্রতিবাদ আর চিরন্তন প্রেম এক সুতোয় গেঁথে সবাইকে মনে করিয়ে দিল নজরুল কেন শতবর্ষ পরও এত জীবন্ত, এত আপন।