মানিকগঞ্জ: পদ্মা, যমুনা আর ইছামতি নদী ঘিরে রেখেছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলা। জেলার সবচেয়ে বড় এই উপজেলার আয়তন ২৪৫ দশমিক ৪২ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় বসবাস করেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৬৯ জন মানুষ।
তবে এই বিশাল উপজেলার তিন ইউনিয়নের মানুষের জীবন যেন আটকে আছে নদীর ওপারে। আজিমনগর, লেছড়াগঞ্জ ও সুতালড়ি ইউনিয়নের চারপাশে নদী। উপজেলা কিংবা জেলা সদরে যাওয়ার জন্য নেই কোনো সড়কপথ। তাই জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনে তাদের ভরসা ইঞ্জিনচালিত নৌকা।
আজিমনগর ইউনিয়নের আয়তন ১৫ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার। ২৬টি গ্রামে এখানে বসবাস করেন ৫ হাজার ১৭৬ জন। ১১ দশমিক ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের ১৭টি গ্রামে মানুষের সংখ্যা ১২ হাজার ৮০৪ জন। আর ৬ দশমিক ৩৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুতালড়ি ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামে বাস করেন ১ হাজার ৫৮২ জন।
সব মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ৫৬২ মানুষের জীবন-জীবিকা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জরুরি প্রয়োজন নির্ভর করছে নদীপথের ওপর। ভোর হলেই শুরু হয় নদীপাড়ের মানুষের ব্যস্ততা। কেউ যাবেন উপজেলা সদরে, কেউ বাজারে, কেউ চিকিৎসকের কাছে। শিক্ষার্থীদের যেতে হয় স্কুল-কলেজে। কৃষককে নিতে হয় মাঠের ফসল। সবার গন্তব্য আলাদা হলেও ভরসা একটাই, নৌকা।
হরিরামপুরের আন্ধারমানিক ঘাট থেকে হরিণাঘাট হয়ে সবচেয়ে বেশি যাতায়াত করেন এই তিন ইউনিয়নের মানুষ। অন্যান্য ঘাট দিয়েও যাতায়াতের সুযোগ আছে। তবে আন্ধারমানিক ঘাটটি বেশি ব্যবহৃত হয়। ঘাট থেকে হরিনাঘাট যেতে সময় লাগে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মিনিট। জনপ্রতি ভাড়া ৬০ টাকা। সকাল সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত প্রতিদিন হাজারো মানুষ নদী পার হন।
ওই তিন ইউনিয়নে চাকরি করা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, আমাদের সকাল সাতটার ট্রলার ধরতে হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে আটটার দিকে হরিণাঘাট গিয়ে পৌঁছাই। তারপর সেখান থেকে মোটরসাইকেল কিংবা সাইকেলে করে আমাদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। আর বিকেল সাড়ে ৫টার পর আর কোনো ট্রলার পাওয়া যায় না। সবচেয়ে কষ্ট হয় বর্ষা মৌসুমে।
এই এলাকার মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক অসুস্থতা। কারও হঠাৎ অসুস্থতা দেখা দিলে পরিবারের সদস্যদের প্রথম চিন্তা হয়, কীভাবে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হবে। দিনের বেলায় নৌকা পাওয়া গেলেও সাড়ে ৫টার পর থেকে নৌকা চলাচল বন্ধ থাকে। আর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে বিপদ আরও বাড়ে। অনেক সময় জেলেদের মাছ ধরার নৌকাই হয়ে ওঠে শেষ ভরসা। জেলে দয়া করে নৌকা দিলে তবেই রোগীকে উপজেলা কিংবা জেলা সদরে নেওয়া সম্ভব হয়।
সূতালড়ী ইউনিয়নের চরডুবাইল গ্রামের বাসিন্দা সোহেল মিয়া বলেন, ‘দিনে নৌকা পাওয়া গেলেও বিকাল সাড়ে ৫টার পর ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রাতে কেউ অসুস্থ হলে দুই থেকে তিন হাজার টাকা দিয়ে নৌকা রিজার্ভ করতে হয়, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য কঠিন। আর যদি ট্রলার পাওয়া না যায় তখন জেলেদের মাছ ধরার নৌকাই ভরসা। এতে নদী পাড়ি দেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই চিকিৎসার জন্য সরকার একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স দিলে আমাদের উপকার হতো।’
এই তিন ইউনিয়নের মানুষের কৃষিও নৌকা নির্ভর। মাঠে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে হলে নৌকায় করে নিতে হয় হাটে। কখনো নদী উত্তাল থাকলে নৌযান চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। এতে কৃষকের পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমাদের উৎপাদিত শস্যগুলো ঝিটকা হাটে নিতে হলেও এই নদীপথে যেতে হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে তখন ঘরে বসে থাকতে হয়। তাই এই রুটে যদি সরকার আমাদের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন নৌপথে যাতাযাতের ব্যবস্থা করে দিতেন তাহলে আমাদের হাজারো মানুষের উপকার হতো।’
শিক্ষার্থীদের জন্যও একই বাস্তবতা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীর এপারে বসবাস করলেও তাদের প্রয়োজনের বড় অংশই নদীর ওপারে। উপজেলা সদর, হাসপাতাল, বড় বাজার কিংবা প্রশাসনিক কার্যালয়, সবকিছুর জন্যই নদী পার হতে হয়।
আন্ধারমানিক ঘাটের ট্রলার চালক মো. ফরিদ জানান, যাত্রী ও মালামাল পরিবহণের জন্য এই ঘাটে ১২টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। প্রতিদিন ছয়টি করে নৌকা চলাচল করে। মাস শেষে আয় থেকে নৌকার জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ ১২ জন ট্রলার মালিকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া হয়। প্রতিদিন এই নৌপথ দিয়ে প্রায় হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন।
পদ্মাপাড়ের আন্ধারমানিক ঘাটের বাসিন্দা আবিদ হাসান বলেন, ‘এই নৌপথটি সম্পূর্ণ অনিরাপদ। উত্তাল নদীতে চলাচল করা কোনো নৌকাতেই যাত্রীদের জন্য জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেট বা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই। উপজেলা প্রশাসন কিংবা জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে যাত্রীদের নিরাপত্তায় এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জন্য বিশেষভাবে নৌযান সার্ভিস চালু করে নিরাপদ ও নিয়মিত যাতায়াতের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খান বলেন, ‘হরিরামপুরের মূল সমস্যা নদী ভাঙন। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হরিরামপুরকে রক্ষার জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা। সেটা হলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। ওই ইউনিয়নগুলোর বাসিন্দাদের চলাচলের প্রধান বাহন হচ্ছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। ওই ছোট জনপদের জন্য দীর্ঘ সেতু সেটা সমিক্ষায় আসবে না। তাদের কথা চিন্তা করে সেখানে কীভাবে ভালো সার্ভিস দেওয়া যায় সেটা নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে।’