নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় গ্রামগুলো ভেসে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬০ জন নিহত এবং শতাধিক পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। এছাড়া তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) নেপালের কর্তৃপক্ষের বরাতে এ খবর প্রকাশ করেছে বিবিসি।
বিবিসির খবরে আরও বলা হয়েছে বৃহস্পতিবার সকালে এক বিবৃতিতে পুলিশ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ৬৪ জনের দেহ চিতওয়ান জেলার ভাটির এলাকা থেকে এবং আরও ২৬ জনের দেহ নওয়ালপরাসি পূর্ব থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
কর্মকর্তাদের মতে, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি ভারতীয়, ৫৪ জন মার্কিন, ৩৪ জন অস্ট্রেলিয়ান এবং ৩৩ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া নেপালেরই ১০০ জনেরও বেশি পর্যটক রয়েছেন। এলাকাটি তীর্থযাত্রী ও ট্রেকারদের কাছে জনপ্রিয়।
ট্যুর অপারেটরদের বরাত দিয়ে দেশটির পর্যটন বোর্ড আরও জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ভারত ও নেপালের সীমান্তবর্তী মানস সরোবরের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন।

সেনাবহিনী উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স।
নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকস্মিক বন্যার পর প্রায় ৪০৩ জন পর্যটকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, যাদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি।
পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে বলেছেন যে ২৮ জন পুলিশ সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন। পুলিশের পাশাপাশি সেনা সদস্য ও বিদ্যুৎ কর্মীরাও নিখোঁজ হয়েছেন।
এক নারী বিবিসিকে জানান, ‘আমার চোখের সামনেই আমার পরিবার ভেসে গিয়েছিল’। তিনি ও তার ছেলে একটি ছাদে উঠে প্রাণে বেঁচে যান।
কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ভেবেছিল যে বন্যার আগে হয়তো কোনো ভূমিকম্প হয়েছিল — কিন্তু ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে এখন বলছে, ‘ভূমিকম্পজনিত শক্তিটি আসলে ভূমিধসের কারণে উৎপন্ন হয়েছিল।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং কেও কেও ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে।
নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, নদীর তীব্র পানির তোড়ে বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে দেখা যায়, কাদামাটির নিচ থেকে একটি বাড়ির শুধু ওপরের অংশটি দেখা যাচ্ছে।
দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে তাদের প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, এই দুর্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
জঙ্গল সাফারির জন্য পরিচিত পর্যটন কেন্দ্র চিতওয়ানসহ বেশ কয়েকটি পৌরসভাকে বন্যার পানি বৃদ্ধির কারণে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।

ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে একজন ব্যক্তিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রয়টার্স।
স্থানীয় পুলিশের একজন মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে তাঁরা সতর্ক করেছেন। নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা উপদ্রুত এলাকায় হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলাকর্মী মোতায়েন করেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের জিরং কাউন্টিতে ভূমিধস দুর্যোগে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
সিসিটিভি আরও জানিয়েছে, এদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তবে মৃতের সংখ্যা তিনেই অপরিবর্তিত রয়েছে।
জিরং-এর সীমান্তটি চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও যানবাহন চলাচলের প্রধান সংযোগস্থল।
বুধবার, যৌথ সীমান্তে ভূমিধস শুরু হওয়ার পরপরই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘ব্যাপক হতাহতের’ খবর জানিয়েছিল।
এই দুর্যোগের পর নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ হিমালয়ের এই দেশটিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা এক বিবৃতিতে শাহ বলেন, “অনুগ্রহ করে ধৈর্য ধরুন। আপনাদের উদ্ধার, চিকিৎসা, খাদ্য ও আশ্রয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকার নিচ্ছে। এই ধরনের দুর্যোগের সময়ে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে।”
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপালের পার্বত্য জেলা রাসুয়ায় অবস্থিত প্রায় ৫০,০০০ জনসংখ্যার এলাকা স্যাপ্রু বেসি এবং তিমুরেতে জল এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারেনি।
জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার এলাকার ভোতে কোশী নদীর তীরে বসবাসকারীদের উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিকটবর্তী গ্রাম ও পরিকাঠামো প্রকল্পের স্থানগুলি ভেসে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।