রংপুর: নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের ৪ সদস্য হত্যা মামলায় গ্রেফতার দুই আসামিকে তিনদিনের রিমান্ডে দেওয়ার আবেদন নামঞ্জুর করে দিয়েছেন আদালত। সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে রংপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম এই আদেশ দেন। এর পরিবর্তে আদালত আগামী দুই দিন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, আসামিরা এরইমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তে নতুন কিছু তথ্য পাওয়ায় এবং সম্প্রতি মামলায় নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ায় এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তিনদিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল। তবে আদালত ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার পর রিমান্ডের আইনগত সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।
শুনানিতে আসামিদের আদালতে হাজির না করলেও তাদের পক্ষে লিগ্যাল এইডের আইনজীবীরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশ নেন।
এদিকে মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আসামিদের ডোপ টেস্টের ফলাফল। রোববার (৩০ আগস্ট) রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করে পুলিশ। রংপুর মেডিকেল কলেজের পরীক্ষায় তাদের শরীরে কোনো মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারের প্রায় আট দিন পর এবং হত্যাকাণ্ডের প্রায় দশ দিন পর এই নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাই নমুনায় মাদকের অস্তিত্ব না পাওয়া স্বাভাবিক। পুলিশের দাবি, লোম ও রক্তের নমুনা পরীক্ষা করলেও মাদকের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। তবে রংপুর মেডিকেল কলেজে বর্তমানে এসব পরীক্ষার সক্ষমতা নেই।
মামলার বাদী ও নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী ডোপ টেস্টের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, গ্রেফতারের পরপরই ডোপ টেস্ট করা উচিত ছিল। কয়েকদিন পর প্রস্রাবে মাদকের চিহ্ন থাকে না বলেও তিনি জানান।
বাদী ও নিহতের স্বজনরা পুলিশের কাছে এই মামলার আরও গভীর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, দুইজনের পক্ষে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয় এবং এতে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে। ডোপ টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসায় তারা আরও সন্দিহান হয়েছেন। তাদের মতে, সুস্থ মস্তিষ্কে পরিকল্পিতভাবেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন নাগরিক কমিটিও পুলিশের দেয়া তথ্য নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন তুলে বিচারিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছে, কীভাবে মাত্র দুই কিশোর মাত্র একটি তোয়ালে ও দড়ি দিয়ে চারজনকে হত্যা করতে পারে, এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তাদের চিৎকার কেউ শোনেনি কেন।
গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬০), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী (২৫) ও ছেলে প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর পাশের বাড়ির প্রতিবেশী মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেফতার করা হয়। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। আসামিরা জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে ৯ পিস ইয়াবা সেবনের কথাও স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
মামলাটি বর্তমানে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করছে। পুলিশ আশ্বস্ত করেছে, তারা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।