রংপুর: রংপুরের তারাগঞ্জে গণপিটুনিতে নিহত দুইজন স্বামী-পিতার পরিবার আজও আর্থিক সঙ্কট ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এক বছর পেরিয়ে গেলেও নিহতদের স্ত্রী-সন্তানরা স্বস্তি পাচ্ছেন না; কারণ বিচার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না বললেই চলে। অভিযুক্তদের অধিকাংশই পলাতক, আর আটক কয়েকজন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। স্বজনরা মনে করছেন, প্রশাসন ও পুলিশের প্রতি তাদের আস্থা ধীরে ধীরে কমছে, কারণ তারা এখনও ন্যায়বিচার পাননি। অন্যদিকে, পুলিশ দাবি করছে, তদন্ত শেষ হয়েছে এবং খুব শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে।
রংপুরের তারাগঞ্জের বুড়িরহাটে গত বছরের ৯ আগস্ট রাতে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। রিকশাভ্যান চুরির সন্দেহে উত্তেজিত জনতা দুজন নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করে। তাঁরা হলেন— পেশায় মুচি রূপলাল রবিদাস (৪৮) এবং ব্যাটারিচালিত ভ্যানচালক প্রদীপ লাল রবিদাস (৪৭)। এক বছর পর, সেই ঘটনার শিকার পরিবারগুলি এখনও যেন সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
নিহত রূপলালের স্ত্রী মালতী রানী রবিদাস এখন একটি জুতার কারখানায় কাজ করেন। মাসে মাত্র ৬ হাজার টাকা আয়ে কোনওমতে সংসার চালান তিনি। তিনি জানান, ‘স্বামী চলে যাওয়ার পর থেকে আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত সংগ্রামে কাটছে। বড় মেয়েকে অনেক কষ্টে বিয়ে দিয়েছি। ছোট মেয়ে ও ছেলে এখনও পড়াশোনা করে। সরকারি ও বেসরকারি সাহায্য পেয়েছি, কিন্তু তা সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়।’
প্রদীপের ছেলে দুলাল গ্রাম পুলিশ হিসেবে চাকরি নিয়েছেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনিই এখন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। ছোট ভাই-বোনদের পড়াশোনার খরচ বহন করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘বাবা না থাকায় সব দায়িত্ব আমার উপর। অথচ বেতন খুবই সামান্য। সংসার চালানো অনেক কঠিন হয়ে গেছে।’
বিচারের ধীরগতি ও নিরাপত্তাহীনতা
গণপিটুনির ঘটনার পরদিন রূপলালের স্ত্রী থানায় ৭০০ অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পুলিশ প্রায় ৭০ জনকে শনাক্ত করলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তারা সবাই জামিনে মুক্তি পান। বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে নিহতদের পরিবার আতঙ্কে রয়েছে।
দুলাল অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা এখনও নিরাপদ বোধ করি না। কারণ অধিকাংশ আসামি ধরা পড়েনি। পুলিশের সঙ্গেও যোগাযোগ করলে সঠিক সাড়া পাই না। আমরা ভয় পাই, বিচার কি আদৌ হবে?’
যদিও পুলিশ বলছে, তারা তদন্ত শেষ করেছে এবং আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তারাগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) আবদুল্লাহ আল মামুদ জানান, ‘ঘটনার পর থেকেই আসামিরা আত্মগোপনে চলে গেছে। তবে তাদের গ্রেফতারে আমরা অভিযান চালাচ্ছি। তদন্ত শেষ হয়েছে, শিগগিরই চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।’
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ মাহামুদুল হক মনে করেন, রংপুরের এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন গণপিটুনির ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে আইনের শাসন, প্রান্তিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং গণআতঙ্কের একটি উদাহরণ। বিশেষ করে, নিহত দুই ব্যক্তি দলিত সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন, যা সামাজিক বৈষম্য ও দুর্বল গোষ্ঠীগুলোর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গণপিটুনির ঘটনা নতুন নয়; তবে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া এবং অভিযুক্তদের দ্রুত জামিন পাওয়ার প্রবণতা ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য হতাশা বাড়ায়।’
আইনজীবীরা বলছেন, এসব ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ও ফরেনসিক প্রমাণের অভাবে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা আসামিদের আইনি সুবিধা দেয়। অন্যদিকে, সমাজকর্মীরা মনে করেন, গণপিটুনি রুখতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং আইনের দ্রুত প্রয়োগ জরুরি, যাতে দোষীরা শাস্তি পায় এবং ভবিষ্যতে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস না পায়।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ মাহামুদুল হক বলেন, ‘এই মামলার রায় হলে অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি রোধে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বিচারহীনতা সেই পরিবারগুলোকে আরও দুর্বল করে তুলেছে, যারা কেবল অর্থনৈতিক নয়—মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।’
এদিকে স্বজনদের একটাই প্রশ্ন— কবে তারা ন্যায়বিচার পাবেন। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, চার্জশিট জমা পড়লেও আদালতের কার্যক্রম ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার শেষ হতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। প্রশ্ন থেকে যায়— সেই পর্যন্ত এই পরিবারগুলো কীভাবে টিকে থাকবে?