রংপুর: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) অসুস্থতার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণেও যদি কেউ মিড সেমিস্টার পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারেন, তবে তাকে জরিমানা গুনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পরেই ক্যাম্পাস জুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ। শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্তকে ‘শিক্ষার্থীবিরোধী’ ও ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবিতে সরব হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমানের সই করা এক অফিস আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদেশে বলা হয়, গত ১১ জুন অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের ৫৭তম সভার সুপারিশ ও ৩০ জুন সিন্ডিকেটের ১২তম সভায় অনুমোদনের ভিত্তিতে ১ জুলাই থেকে এই নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ১ হাজার ২০০ টাকা এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে।
অফিস আদেশটি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ক্যাম্পাসে এর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। শিক্ষার্থীরা বলেন, অসুস্থতা কারও ইচ্ছাধীন বিষয় নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই জরিমানা তাদের ওপর আরেকটি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের। তাদের জন্য এই অর্থ কোনোভাবেই সামান্য নয় বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোশারফ হোসেন বলেন, ‘প্রতিটি বিভাগের একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার থাকা উচিত, যেখানে ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য কার্যক্রমের সময়সূচি স্পষ্ট থাকবে। অন্যথায়, পরীক্ষার সময়সূচি না জানিয়েই হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর জুলুম করার শামিল’।
শিক্ষার্থী ইয়ামিন ইসলামও একই অভিযোগে বলেন, ‘অনেক বিভাগে মিড উইক নেই। শিক্ষকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো তারিখে পরীক্ষা নেবেন, আর কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষা মিস করলেই জরিমানা করবেন এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং একধরনের জুলুম। আমরা চাই, এই ধরনের জরিমানা ব্যবস্থা না থাকুক। মিড উইক থাকবে এবং সেই অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে হবে। তাহলে শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হবে না’।
শিক্ষার্থীরা এই জরিমানার পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন প্রশ্ন রাখেন, ‘৬০ নম্বরের ফাইনাল পরীক্ষার ইমপ্রুভমেন্ট ফি যেখানে ৭২৫ টাকা, সেখানে মাত্র ১৫ নম্বরের মিড সেমিস্টার পরীক্ষায় অনুপস্থিতির জন্য ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা নেওয়ার যৌক্তিকতা কী?’।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান সিয়াম বলেন, ‘প্রশাসন কি একবারও ভেবে দেখেছে, এই টাকাটা কারও এক মাসের সিট ভাড়া, আবার কারও ১৫ দিনের খাবার খরচ। এসব বাস্তবতা বুঝলে, শিক্ষার্থীদের জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হয়ত আরেকবার ভাবা হতো’।
এই পরিস্থিতিতে জরিমানা সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পৃথক স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। বেরোবি ছাত্রদলের সভাপতি রাফায়েল ইমতিয়াজ ইয়ামিন লিখেছেন, শিক্ষকদের সময়মতো ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্যমূলক।
তবে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘জরিমানা করাটা আসলে মুখ্য বিষয় নয়। অকারণে বা ভিত্তিহীন অজুহাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিড সেমিস্টার পরীক্ষা মিস করার প্রবণতা অনেক বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা যে হারে মিড সেমিস্টার পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে, সেই তুলনায় ফাইনাল পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে না। আমরা মনে করি, এই নিয়ম আরোপ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা এড়ানোর প্রবণতা কমবে’।
যদিও শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশাসনের এই যুক্তি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তারা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অসুস্থতার মতো বিষয় বিবেচনা না করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যথায় শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।