ঢাকা: জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম আর পরিবেশ দূষণ নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে হইচই, ঠিক তখনই টু-হুইলার দুনিয়ায় বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। ইভি বা ইলেকট্রিক বাইকের পাশাপাশি এখন সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে আলোড়ন সৃষ্টি করছে ‘ইথানল-চালিত মোটরসাইকেল’। বিশ্বের বড় বড় অটোমোবাইল জায়ান্টরা বাজারে নিয়ে আসছে পেট্রোল ও ইথানলের মিশ্রণে চলা ‘ফ্লেক্স-ফুয়েল’ বাইক। কিন্তু এই প্রযুক্তি ঠিক কী, আর কেনই বা এটি সাধারণ বাইকারদের জন্য গেম-চেঞ্জার? আসুন জেনে নেই, এর বিস্তারিত:
ইথানল বাইক আসলে কী?
সহজ কথায়, যে মোটরসাইকেল পেট্রোল বা অকটেনের বদলে সম্পূর্ণ বা আংশিক ‘ইথানল’ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে চলে, সেটাই ইথানল বাইক। ইথানল হলো এক ধরণের বায়ো-ফুয়েল বা অ্যালকোহল, যা মূলত আখ, ভুট্টা, ভাঙা চাল বা উদ্বৃত্ত শস্যদানা থেকে তৈরি করা হয়।বর্তমানে বাজারে থাকা ‘ফ্লেক্স-ফুয়েল’ প্রযুক্তির বাইকগুলোতে ১০০% পেট্রোল থেকে শুরু করে ১০০% ইথানল যেকোনো অনুপাতে জ্বালানি মিশিয়ে অনায়াসে চালানো যায়। এর জন্য ইঞ্জিনে বিশেষ সেন্সর ও ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়।
কেন আজ ইথানলের এত প্রয়োজন?
জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট: খনিজ তেল বা পেট্রোলিয়ামের ভাণ্ডার সীমিত। আজ হোক বা কাল, এই তেলের উৎস শেষ হবেই। তাই টেকসই বিকল্প হিসেবে ইথানলই সেরা ভবিষ্যৎ।
অর্থনৈতিক মুক্তি: বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশকে চড়া ডলারে বাইরে থেকে পেট্রোল আমদানি করতে হয়। ইথানল দেশেই কৃষিজাত পণ্য থেকে উৎপাদন করা সম্ভব, যা দেশের কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করবে।
সবুজ পৃথিবী: বৈশ্বিক উষ্ণতা ও বায়ু দূষণ কমাতে ইথানলের ভূমিকা অনবদ্য। এটি ব্যবহারে কার্বন নিঃসরণ এক ধাক্কায় প্রায় $৮০\%$ পর্যন্ত কমে যায়।
রাইডারদের জন্য চমৎকার ৪ সুবিধা-
সাধারণ বাইকার হিসেবে আপনি কেন পেট্রোল ছেড়ে ইথানল বাইক বেছে নেবেন? এর সুবিধাগুলো সত্যিই চোখ কপালে তোলার মতো।
পকেটের খরচ কমবে: পেট্রোল বা অকটেনের তুলনায় ইথানলের উৎপাদন খরচ অনেক কম। ফলে ইথানল চালিত বাইক ব্যবহারে প্রতি কিলোমিটারের রাইডিং খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
স্মুথ পারফরম্যান্স: বিশুদ্ধ ইথানলের অকটন রেটিং (প্রায় ১০৮) সাধারণ অকটেনের চেয়েও অনেক বেশি। এর মানে হলো, বাইকের ইঞ্জিন অনেক বেশি স্মুথ চলবে এবং ‘নকিং’ বা খটখটানি শব্দ হবে না।
ইঞ্জিন থাকবে ঠাণ্ডা ও দীর্ঘস্থায়ী: ইথানল পুড়লে ইঞ্জিনের ভেতরের তাপমাত্রা পেট্রোলের চেয়ে কম থাকে। ফলে লং রাইডেও ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হওয়ার ঝুঁকি থাকে না, যা ইঞ্জিনের আয়ু বাড়িয়ে দেয়।
কম মেইনটেইন্যান্স খরচ: ইথানল ইঞ্জিনের ভেতরে ক্ষতিকর কার্বন বা ঝুল জমতে দেয় না। স্পার্ক প্লাগ এবং পিস্টন পরিষ্কার থাকায় বারবার মেকানিকের কাছে দৌড়াতে হবে না।
ইভি বনাম ইথানল: ইলেকট্রিক বাইক (EV) চার্জ দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে, আবার ব্যাটারি নষ্ট হলে বিশাল খরচ। কিন্তু ইথানল বাইকে সেই ঝামেলা নেই। সাধারণ বাইকের মতোই মাত্র ২ মিনিটে ফুয়েল পাম্প থেকে তেল ভরে আপনি হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে পারবেন।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: এটি কি এখন পাওয়া যাচ্ছে?সরাসরি বলতে গেলে, বর্তমানে (২০২৬ সালে) বাংলাদেশের ফুয়েল পাম্পগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে ১০০% বিশুদ্ধ ইথানল কিংবা আলাদাভাবে ‘ইথানল ফুয়েল’ বিক্রি শুরু হয়নি। তবে সরকার পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতিমালার অংশ হিসেবে পেট্রোল ও অকটেনের সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণে ইথানল মিশ্রণের (Ethanol Blending) পাইলট প্রজেক্ট ও নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে। বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড (যেমন- ইয়ামাহা, হোন্ডা, টিভিএস, বাজাজ) ইতিমধ্যেই পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে তাদের জনপ্রিয় বাইকগুলোর ‘ফ্লেক্স-ফুয়েল’ (Flex-Fuel) সংস্করণ বাজারে ব্যাপক হারে বিক্রি শুরু করেছে। বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি নিয়ে অটোমোবাইল খাতের আলোচনা এখন তুঙ্গে।
বাস্তবায়ন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত
বাংলাদেশে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি চালুর ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত রূপরেখার ওপর জোর দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে,
বিশাল অংকের সাশ্রয়: হিসাব অনুযায়ী, দেশে ‘ই৫’ অর্থাৎ পেট্রোল বা অকটেনের সাথে মাত্র ৫ শতাংশ ইথানল মিশ্রণ সফলভাবে চালু করা গেলে বছরে ৫০ হাজার টনেরও বেশি আমদানিকৃত অকটেন সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। যা দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা (ডলার) বাঁচানোর পাশাপাশি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা অনেক বেশি জোরদার করবে।
তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নয়: তবে বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই রূপান্তর সফল করতে হলে কোনোভাবেই হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। আজ ঘোষণা দিয়ে আগামীকালই পাম্পে ‘ই৫’ ফুয়েল চালু করার মতো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক বা উল্টো প্রভাব ফেলতে পারে।
ধাপে ধাপে রূপান্তর: এটি হতে হবে একটি ধাপে ধাপে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। উদাহরণস্বরূপ—প্রথম ধাপে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা রাজশাহীর মতো বড় বড় শহরগুলোতে সীমিত আকারে কেবল সরকারি যানবাহন, সিটি করপোরেশনের পরিবহন, গণপরিবহন এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার যানবাহনে ইথানল মিশ্রিত ‘ই৫’ জ্বালানি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে যেমন রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট মহলের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা অর্জন হবে, তেমনই সাধারণ বাইকার ও সাধারণ বাজারের ভোক্তাদের মনে এই জ্বালানি নিয়ে শতভাগ আস্থা তৈরি হবে।
দেশের রাইডাররা এটি কীভাবে পাবেন?
যেহেতু সরাসরি ইথানল ফুয়েল এখনও আমাদের পাম্পে সহজলভ্য নয়, তাই দেশের বাইকারদের স্মার্টলি কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:
E20 বা Flex-Fuel ইঞ্জিন বাইক কেনা: আপনি যদি ভবিষ্যতের প্রযুক্তির সাথে আপ-টু-ডেট থাকতে চান, তবে এখন বাইক কেনার সময় সেটি ‘$E20$’ (২০% ইথানল মিশ্রণ উপযোগী) বা ‘Flex-Fuel’ সমর্থিত ইঞ্জিন কি না, তা শোরুম থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
অফিসিয়াল ও গ্রে-মার্কেট আমদানির দিকে নজর রাখা: বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো খুব শীঘ্রই ফ্লেক্স-ফুয়েল মডেলগুলো দেশের বাজারে আনার প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে জানা গেছে। এছাড়া বিভিন্ন লোকাল আমদানিকারকদের মাধ্যমেও এই বিশেষ প্রযুক্তির বাইকগুলো প্রি-অর্ডার দিয়ে আনা সম্ভব।
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় ইথানল-চালিত মোটরসাইকেল কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং এটিই টু-হুইলার ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ। পকেটের টাকা বাঁচিয়ে, ইঞ্জিনের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স উপভোগ করার পাশাপাশি পরিবেশকে সবুজ রাখার এমন সুযোগ কোনো রাইডারই হাতছাড়া করতে চাইবেন না। সরকারি গ্রিন সিগন্যাল এবং বিশেষজ্ঞদের সুপরামর্শ মেনে পরিকল্পিতভাবে এগোলে খুব শীঘ্রই হয়তো বাংলাদেশের সড়কেও দেখা মিলবে ইথানলের তৈরি এই পরিবেশবান্ধব সবুজ ইঞ্জিনগুলো।