ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়ে ও শপথ নিতে পারলেন না চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসন থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। ব্যাংক এশিয়া ও যমুনা ব্যাংকের প্রায় দুই কোটি টাকার ঋণখেলাপির দায়ে শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা হারাতে হলো তাকে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ এক চূড়ান্ত রায়ে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন। ফলে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে জয়ী হলেও তার সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেল।
সর্বোচ্চ আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়ের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই আসনের কী হবে এখন? আর এই আসনের নির্বাচন পরবর্তী অবস্থা কেনইবা এমন হলো। কমিশনের কি কোনো দায়ভার ছিল না? আইনি মারপ্যাঁচে চার মাস ধরে ঝুলে থাকা এই আসনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, ভোট নিয়ে আদালতের আদেশের কপি দেখে সিদ্ধান্ত নেবে তারা।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, ‘কমিশন এই মুহূর্তে কোনো স্বতঃপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। বরং, পুরো বিষয়টি এখন আদালতের লিখিত নির্দেশনার ওপর নির্ভর করছে। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে কমিশন সভায় বসে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আদালত যদি নতুন করে তফসিল ঘোষণা করে সীতাকুণ্ডে নির্বাচনের আদেশ দেয়, তবে কমিশন নতুন করে ভোটের আয়োজন করবে। আর এটি কোনো উপনির্বাচন হবে না, বরং একটি সম্পূর্ণ নতুন সাধারণ নির্বাচন হবে। আর আদালত যদি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণার আদেশ দেয়, তবে কমিশন সেই অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ করবে।
এদিকে নতুন নির্বাচন হলে আসলাম চৌধুরী ফের ভোটে অংশ নিতে পারবেন কি না? এমন প্রশ্নে ইসি জানিয়েছে, তিনি যদি ভোটের আগে তার ঋণসংক্রান্ত অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠতে পারেন, তবে অন্যদের মতো তারও প্রার্থী হতে বাধা থাকবে না।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক আইনি দূরদর্শিতা এবং ব্যাংক ঋণের জামিনদারদের দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে দায় নির্বাচন কমিশনেরও রয়েছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘কমিশন চাইলে মনোনয়ন গ্রহণের সময়ই বিষয়টা এত হালকাভাবে না নিয়ে কঠোরভাবে নিতে পারতো।’
তিনি বলেন, ‘এখন বিষয়টা আদালতের হাতে চলে গেছে।’ তিনি আগের বিষয় উল্লেখ করে বলেন, “আমরা নির্বাচনের সময় সংবাদ সম্মেলন করে বলেছি, মনোনয়নের সময় ঋণখেলাপিদের বিষয়ে কমিশন শিথিলতা প্রদর্শন করেছে। সেসময় একজন কমিশনার বলেছিলেন, ‘মনোনয়ন বৈধ করে দিলাম টাকাটা পরিশোধ করে দিয়েন।’ ওই সময়ই আমরা একজন কমিশনারের এমন বক্তব্যে বেশ সমালোচনা করেছিলাম। কমিশন কঠোরতা প্রদর্শন করেনি। কমিশনের আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল।”
এ বিষয়ে আরেক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. আব্দুল আলিম সারাবাংলাকে বলেন, ‘শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, পার্লামেন্টেরও দায়িত্ব এই ঋণখেলাপির বিষয়ে পরিষ্কার সংজ্ঞা দেওয়া; কখন-কাকে-কী অবস্থায় ঋণখেলাপি বলা যাবে। আর তখন যেহেতু পার্লামেন্ট ছিল না…বাট তখন তো অধ্যাদেশ হতো। কমিশনের দায়িত্ব ছিল বা বোঝা উচিত ছিল এই ঋণখেলাপির বিষয়টা। একই সঙ্গে যারা এই আইনটা তৈরি করেছিল তাদেরও দায় আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন বিষয়টা যেহেতু আদালতের কাছে, তাই আগামী নির্বাচনের জন্য এখন প্রয়োজন এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা দেওয়া। আইনটাকে পরিষ্কার করা, যাতে আগামী নির্বাচনের পর এই বিষয়ে এই ঝামেলা না হয়।’
আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল হলো যেভাবে
জানুয়ারিতে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় নির্বাচন কমিশন আসলাম চৌধুরীকে মূল ঋণগ্রহীতা না বলে কেবল জামিনদার হওয়ার যুক্তিতে বৈধতা দিয়েছিল। এমনকি শুনানির সময় নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ আসলাম চৌধুরীকে ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়ার মৌখিক অনুরোধও করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টও তার প্রার্থিতা বহাল রাখলে তিনি ভোটযুদ্ধে নামেন। তবে জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিক এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে গেলে গত ৩ ফেব্রুয়ারি আদালত ভোটের ফলাফল প্রকাশের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়।
আজ চূড়ান্ত রায়ের পর জামায়াত প্রার্থীর আইনজীবী শিশির মনির সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন হয়তো ভুলে গিয়েছিল যে, ঋণের জামিনদার আর মূল ঋণগ্রহীতার দায় একই। আপিল বিভাগের এই রায় ভবিষ্যতে নির্বাচনি আইন মানার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।’ তিনি দাবি করেন, প্রচলিত নিয়মে শীর্ষ প্রার্থী অযোগ্য হলে পরবর্তী জনই নির্বাচিত হন, তাই জামায়াত প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার সুযোগই সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আইনি ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। তিনি মনে করেন, পূর্ণাঙ্গ রায় না দেখে চূড়ান্ত পরিণতি বলা মুশকিল হলেও এই আসনে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।
তার মতে, ‘কোনো প্রার্থীর অযোগ্যতা চিরস্থায়ী নয় এবং নতুন তফসিল হলে আইনি প্রক্রিয়া মেনে আসলাম চৌধুরীরও আবার ফেরার পথ উন্মুক্ত হতে পারে।’ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর আইনজীবীদের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে এখন সবার চোখ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপির দিকে।
সীতাকুণ্ডের ১ লাখ ৪২ হাজার ভোটারের রায় বাতিলের পর সেখানে নতুন ভোটের বাদ্য বাজবে, নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জামায়াত প্রার্থী সংসদের টিকিট পাবেন, তা কেবল নির্ভর করছে আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ওপর।