ঢাকা: পদ্মার চরাঞ্চল থেকে তিস্তার নদীখাত, চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল থেকে বঙ্গোপসাগরের বন্দর—বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রে গত এক দশকে ক্রমেই দৃশ্যমান হয়েছে চীনের বিনিয়োগ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক, রেল, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও মেগা অবকাঠামো নির্মাণে চীন এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। এসব বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও, এ উন্নয়নযাত্রায় জড়িয়ে আছে চড়া সুদের বাণিজ্যিক ঋণ, ইপিসি চুক্তি ও ভূরাজনীতির ভারসাম্য নিয়ে জটিল সমীকরণ। মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল বা তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো প্রজেক্টগুলোর উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশাপাশি বাংলাদেশের আসল লাভ-ক্ষতির হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
চীনা বিনিয়োগের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চীন ও হংকং থেকে আসা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (FDI) স্টক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বর্তমানে দেশে ১,০০০টিরও বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান কর্মরত রয়েছে, যা প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ২০১৯-২০২৪ সময়ের মধ্যে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে ৪.৩৮ বিলিয়ন ডলার এফডিআই এসেছে। যা দেশে দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই খাতে চীনের মোট বিনিয়োগ ছিল ১২.৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ৬.৩৬ বিলিয়ন ডলার (৫১.৭%), বিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোতে ৩.২ বিলিয়ন ডলার (২৬%), গ্যাসভিত্তিক প্রকল্পে ১.১৫ বিলিয়ন ডলার (৯.৪%), তেলভিত্তিক প্রকল্পে ৯৯০ মিলিয়ন ডলার (৮.১%) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ৫৯০ মিলিয়ন ডলার (৪.৮%) বিনিয়োগ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিনিয়োগের প্রায় ৮১ শতাংশ এসেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, যেখানে বেসরকারি খাতের অংশ ছিল মাত্র ৬.৮ শতাংশ।
কূটনৈতিক দৃশ্যপট ও উচ্চপর্যায়ের সফর
সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার চার মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মালয়েশিয়া থেকে ১৮ ঘণ্টার এই সফরে দুই দেশের মধ্যে সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (MoU) সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও প্রোটোকল সই হয়েছে।
এই সফরের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে- মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ অবকাঠামো চুক্তি, চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চল ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল সংক্রান্ত চুক্তি, চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক যৌথ কর্মপরিকল্পনা এবং বাংলাদেশ থেকে চীনে টাটকা কাঁঠাল রফতানির ফাইটোস্যানিটারি প্রোটোকল। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (CPC) মধ্যে বিনিময় চুক্তি সই হয়েছে। এছাড়া বাসস, বিটিভি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সিনহুয়া ও চায়না মিডিয়া গ্রুপের একাধিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উভয় পক্ষ চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোর ও বন্দরকেন্দ্রিক মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট কানেক্টিভিটি নিয়েও যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চলের যাত্রা শুরু
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেশের শিল্পায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এর ফলে, প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রায় ৭৭৬ একর (৩১৪.৩৯ হেক্টর) এলাকায় গড়ে ওঠা এ শিল্পাঞ্চলে ৩৬ হাজারের বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা
উত্তরবঙ্গের নদী ব্যবস্থাপনা ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নদীর দুই তীর সংরক্ষণ, খনন, ব্যারেজ পুনর্নির্মাণ ও আধুনিক সেচব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বন্যা ও ভাঙন রোধের পাশাপাশি সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হবে এবং রংপুর অঞ্চলে কৃষি ও পর্যটনভিত্তিক ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
২০১৬ সালে ‘পাওয়ার চায়না’র সমীক্ষার পর রাজনৈতিক টানাপড়েনে প্রকল্পটি থমকে গেলেও, পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়। প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা (৭৫০ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের এই পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের জন্য চীনের কাছে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের মূল চ্যালেঞ্জ হলো, উজানে ভারতের পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীলতা, যার কারণে সফলতার জন্য কার্যকর আন্তঃসীমান্ত চুক্তি ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প
৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজবাড়ীর পাংশায় ২.১ কিলোমিটার মূল বাঁধ ও ৭৮টি স্পিলওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ সম্ভব হবে, যা দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষকে সরাসরি উপকৃত করবে।
শিল্পায়ন ও নতুন খাতের বিকাশ
তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে চীনা বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে-হান্দা ইন্ডাস্ট্রিজ, কাইশি গ্রুপ, চায়না লেসো গ্রুপ। ২০২৫ সালে এই তিন প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে ৩২২ মিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দেয়।
অবকাঠামো চীনের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের অংশ, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন উন্নয়ন, সেতু, ফ্লাইওভার, রেললাইন আধুনিকায়ন। এগুলোর বেশিরভাগই ঋণ অথবা ইপিসি ভিত্তিক, তাই এগুলো প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয় না।
বন্দর ও লজিস্টিক চীনা কোম্পানিগুলো অংশ নিয়েছে মোংলা বন্দর উন্নয়ন, পায়রা বন্দরের অবকাঠামো, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প।
উৎপাদনশিল্প চীনের বিনিয়োগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে প্লাস্টিক, সিরামিক, ইলেকট্রনিক্স, নির্মাণসামগ্রী, স্মার্ট মিটার, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, স্টিল ও ভারী শিল্প। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার উৎপাদন ও র কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এসব বিনিয়োগ বাড়ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশ্বব্যাপী কার্বন নিরপেক্ষতার নীতির কারণে চীনা বিনিয়োগের নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ, গ্রিন এনার্জি অবকাঠামো। বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলবাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর আওতায় চীনের আগ্রহ রয়েছে- চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চল, মিরসরাই শিল্পাঞ্চল, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল। এসব অঞ্চলে ইলেকট্রনিক্স, টেক্সটাইল, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, হালকা প্রকৌশল ও রাসায়নিক শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে। তাদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে, মোবাইল নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি, অপটিক্যাল ফাইবার, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, ডেটা ট্রান্সমিশন সরঞ্জাম, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্মার্ট সিটি প্রযুক্তি।
কেন বাংলাদেশে চীনের আগ্রহ বাড়ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের প্রতি চীনের আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থান; বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক যোগাযোগ; বৃহৎ শ্রমশক্তি; তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়; ১৭ কোটির বেশি ভোক্তার বাজার; রপ্তানিমুখী শিল্পের সম্ভাবনা; বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই); চায়না প্লাস ওয়ান কৌশলের ফলে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্রের প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব
চীনা বিনিয়োগের ফলে ইতোমধ্যে কয়েকটি ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্পাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নত হয়েছে। উৎপাদনশিল্পে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। যোগাযোগ ও লজিস্টিক ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিল্পে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয়েছে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়, বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণনির্ভর হওয়ায় ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে। চীনা বিনিয়োগের বড় অংশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে কেন্দ্রীভূত। বিনিয়োগে আরও বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রকৌশলী ও শিল্পে পর্যাপ্ত প্রযুক্তি স্থানান্তর হয় না। ফলে দেশীয় সক্ষমতা প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। বাংলাদেশ চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও রফতানি তুলনামূলক কম। এতে দীর্ঘদিন ধরেই বড় বাণিজ্য ঘাটতি বিদ্যমান।
সামনে কী আসছে?
২০২৬ সালে চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ৯.২১ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবিত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্যাস অনুসন্ধান, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, ই-ওয়েস্ট রিসাইক্লিং, স্মার্ট মিটার উৎপাদন, লিথিয়াম ব্যাটারি, কোল্ড চেইন অবকাঠামো, সৌরবিদ্যুৎ, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে (পিপিপি)।
এ ছাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি), ব্যাটারি উৎপাদন, সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট উপাদান, ডেটা সেন্টার এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতেও ভবিষ্যতে চীনা বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই এখনও প্রস্তাব বা সমঝোতা পর্যায়ে রয়েছে।
সুবিধা-ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ করণীয়
চীনা বিনিয়োগ ও বড় মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামোগত প্রবৃদ্ধি ও ব্যাপক কর্মসংস্থান নিশ্চিত হলেও অর্থনীতিবিদরা ঝুঁকির কথাও বলছেন। প্রথমত, ২৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ বড় ধরনের ঘাটতিতে রয়েছে এবং মেগা প্রকল্পগুলোর অনিয়ন্ত্রিত ঋণ পরিশোধের চাপ ভবিষ্যতে বৃদ্ধি পেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বড় বড় প্রকল্পে দেশীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলোর পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তি ও সবুজ প্রযুক্তিতে স্থানান্তরিত হওয়া প্রয়োজন।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘যেকোনো বিনিয়োগই দেশের অগ্রগতির জন্য একটি বড় সুযোগ, আর তা যদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে হয়, তবে তা অর্থনীতির চিত্রই বদলে দিতে পারে। তবে, চড়া সুদের বৈদেশিক ঋণ ও বৈষম্যমূলক চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে। বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগে সুদের হার চড়া এবং ঋণদাতা দেশের স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পায়। তাই চীনা ঋণের ওপর অন্ধ নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কম সুদে ও সহনীয় শর্তে বিকল্প অর্থায়নের উৎস খোঁজা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ বা ঋণ আসাটাই কেবল শেষ কথা নয়, এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তা থেকে সর্বোচ্চ সুফল আদায় করা। সরকার যদি বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনার মাধ্যমে সবচেয়ে কম সুদে এবং দেশের জন্য সুবিধাজনক শর্তে ঋণ ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারে, তবে এই অংশীদারিত্বগুলো আমাদের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সাফল্য অর্জনে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।’
অন্যদিকে জ্বালানি খাতেও চীনা বিনিয়োগও অনেক। এ খাতে অনিয়ন্ত্রিত ও চড়া সুদের বাণিজ্যিক ঋণ দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম। জ্বালানি খাতে চীন বিনিয়োগের বিষয়ে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি ও চড়া সুদের ঋণের কারণে জ্বালানি খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ সরকারের আয়ের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ ঘাটতি তৈরি করায় সরকার রানিং বিল ও ঋণের কিস্তি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। ক্ষতিকর এসব চুক্তি এখনই পুনর্মূল্যায়ন না করলে দেশ চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়বে।’
মূলত বিদেশি বিনিয়োগে অংশীদারিত্বের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে বিনিয়োগের গুণগত মান, ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং পরিবেশ সুরক্ষার ওপর। সঠিক নীতিগত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।