বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত চীন সফরকে ‘পূর্ণাঙ্গ সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, এই সফর ঢাকা ও বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার করেছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ঢাকায় চীন দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সফরের ফলাফল তুলে ধরার সময় তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
ইয়াও ওয়েন বলেন, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সাফল্য। এটি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক, যা সম্পর্কটিকে এক নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে আস্থার এক নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে এবং তিনি প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’-কে একটি নতুন কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত ইয়াও বলেন, অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির বিষয়টি নতুন কিছু নয়; কারণ ১৫ বছর আগেই বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
তিনি বলেন, বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর’ গড়ে তুলতে চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রাষ্ট্রদূত জানান, ভারত বা অন্য যেকোনো দেশের এতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে চীন ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে তবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেই নিতে হবে।
রাষ্ট্রদূত ইয়াও উল্লেখ করেন যে, সফরকালে ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ (টিআরসিএমআরপি)-এর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে, কারণ এর সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত।
তিনি আরও বলেন, ‘তিস্তা প্রকল্পটি বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগ; এটি আপনাদেরই প্রকল্প।’
এছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের প্রধান অর্জনগুলো নিয়েও কথা বলেন-যার মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপের সূচনা এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ‘২+২’ সংলাপ ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা যাচাই।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত ইয়াও বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সহযোগিতা অত্যন্ত ব্যাপক এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সেই সামগ্রিক সহযোগিতারই একটি অংশ।
তবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা-সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
এ সময় দূতাবাসের পরিচালক ঝাং জিং এবং কাউন্সিলর সং ইয়াং-ও উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান শনিবার (২৭ জুন) বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে ‘ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব’ থেকে উন্নীত করে ‘বাংলাদেশ-চীন অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনটি তে রূপান্তর করা হয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সর্বোচ্চ স্তর।
মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরের অর্জনগুলো তুলে ধরার সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ ধাপ।
রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি আনুষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে উভয় পক্ষ দল-পর্যায়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে।
সম্প্রতি এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর বলেন, `২+২’ সংলাপ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে আমরা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। বিষয়টি এখনও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে… আমরা এটি খতিয়ে দেখব।’
২+২” সংলাপ প্রক্রিয়া, যা সাধারণত উভয় দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের অংশগ্রহণে একটি উচ্চ-পর্যায়ের কাঠামো, একসময় পশ্চিমা দেশগুলোর একটি প্রধান কূটনৈতিক হাতিয়ার ছিল, কিন্তু এখন চীন কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করতে এটি সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করছে। বেইজিং এই কাঠামোটি ব্যবহার করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা গভীরতর করতে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা রক্ষা করতে এবং বাহ্যিক চাপের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া সমন্বয় করতে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে বাংলাদেশ ও চীন সমঝোতা স্মারক, চুক্তি, একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা এবং একটি কৃষি বাণিজ্য প্রোটোকলসহ ১৭টি দ্বিপাক্ষিক দলিল স্বাক্ষর করেছে।
উভয় পক্ষ গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।
এছাড়াও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে বিনিময় ও সহযোগিতা বিষয়ক আরেকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
জিডিআই মানবজাতির যৌথ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে, জাতিসংঘের ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বৈশ্বিক উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় ভূমিকা রাখে।
স্বাক্ষরিত অন্যান্য নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে: বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি; মোংলা বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্প বিষয়ক চুক্তি; ‘২০২৬ মানবসম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতা কর্মসূচি’ যৌথভাবে বাস্তবায়নের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ); বাংলাদেশ থেকে চীনে তাজা কাঁঠাল রপ্তানির ক্ষেত্রে ফাইটোস্যানিটারি (উদ্ভিদ-স্বাস্থ্য সংক্রান্ত) শর্তাবলী বিষয়ক কৃষি বাণিজ্য প্রটোকল; চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মধ্যে সহযোগিতা জোরদারকরণ বিষয়ক স্মারকলিপি; সিএমজি ও বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক; সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) মধ্যে সমঝোতা স্মারক; সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক; চীনা ভাষা শিক্ষা বিষয়ক সহযোগিতা চুক্তি; কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় সহযোগিতা জোরদারকরণ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক; সবুজ উন্নয়নে বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে সমঝোতা স্মারক; বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে রপ্তানি উন্নয়ন বিষয়ক যৌথ কর্মপরিকল্পনা; চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের (সিইআইজেড) জন্য শিল্প উন্নয়ন ও ভূমি ইজারা চুক্তি; চীন-বাংলাদেশ মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের লক্ষ্যে সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক; এবং চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি)-এর সাথে বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তি।
এছাড়া বাংলাদেশ ও চীন সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানি সম্পদ পরিকল্পনা, জলবিজ্ঞান বিষয়ক পূর্বাভাস প্রদান, বন্যা প্রতিরোধ ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।
মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মধ্য দিয়ে নিজের প্রথম বিদেশ সফর শেষ করে শুক্রবার বেইজিং থেকে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
উদীয়মান অর্থনীতির প্রতিনিধিত্বকারী একজন নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF)-এর ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে (যা ‘সামার দাভোস’ নামেও পরিচিত) যোগ দেন।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে; এই ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রীকে ফোরামে এ বিষয়ে মূল বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
বেইজিংয়ে দ্বিপাক্ষিক সফরের সময় উভয় দেশ ‘মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ প্রকল্প’ এবং চট্টগ্রামে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প’ বাস্তবায়নের কাজ ত্বরান্বিত করতে সম্মত হয়েছে।
এছাড়া তারা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় বড় ও ছোট-উভয় ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়েও একমত হয়েছে।
উভয় পক্ষ আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরদার করার প্রস্তাব-বিশেষ করে কুনমিং থেকে বাংলাদেশের বন্দরগুলো পর্যন্ত মাল্টি-মোডাল বা বহুমুখী পরিবহন সংযোগ-এবং ‘চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর’ সংক্রান্ত চীনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছে।
‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’-এর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করছে। চীন সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং উভয় পক্ষই প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ ত্বরান্বিত করতে সম্মত হয়েছে।