ঢাকা: ১৪ জুলাই ২০২৪ । কোটা সংস্কারের দাবিতে অনড় তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতায় এটি হয়ে উঠল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সকালের আলো ফোটার পর থেকেই রাজধানী ঢাকার বাতাস ভারী হতে শুরু করে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পদধ্বনিতে। বেলা ১১টা বাজতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এসে জড়ো হতে থাকেন রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো ছাত্র-ছাত্রী, যাদের চোখে ছিল বৈষম্যমুক্ত নতুন এক সমাজ গড়ার প্রত্যয়।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সেদিন সবার লক্ষ্য ছিল একটাই- গণভবন বা সচিবালয় নয়, সরাসরি রাষ্ট্রের অভিভাবক রাষ্ট্রপতির কার্যালয় বঙ্গভবন অভিমুখে এক বিশাল পদযাত্রা। দুপুর ১২টায় যখন সেই জনস্রোত যাত্রা শুরু করে, তখন শাহবাগ, মৎস্য ভবন থেকে শুরু করে হাইকোর্ট এলাকা পর্যন্ত বিশাল সব ব্যারিকেড ও জলকামান নিয়ে প্রস্তুত ছিল শত শত পুলিশ সদস্য। কিন্তু তারুণ্যের সেই উত্তাল ঢেউয়ের সামনে লোহার ব্যারিকেড যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল, পুলিশি বাধা ডিঙিয়ে শিক্ষার্থীরা একের পর এক প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে গুলিস্তান জিরো পয়েন্টের দিকে ধেয়ে যেতে থাকে।
পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার রোমাঞ্চকর উপাখ্যান ও বঙ্গভবনে স্মারকলিপি
গুলিস্তান জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর পর যখন পুলিশ আবারও সাঁজোয়া যান আর জলকামান নিয়ে আন্দোলনকারীদের পথ আগলে দাঁড়ায়, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দমে না গিয়ে প্রখর রোদ আর আকস্মিক বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজপথেই বসে পড়ে স্লোগান দিতে শুরু করে। এক পর্যায়ে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে জিরো পয়েন্টের সেই শক্তিশালী প্রতিরোধ ভেঙে তারা গুলিস্তান পাতাল মার্কেটের কাছাকাছি চলে যায়, যেখানে পুলিশের এপিসি কার আর বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল।
অবশেষে বেলা আড়াইটার দিকে আন্দোলনের মাঠ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের ১২ সদস্যের একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল সমস্ত বাধা পেরিয়ে বঙ্গভবনে প্রবেশ করে এবং রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের কাছে তাদের ঐতিহাসিক স্মারকলিপি জমা দেয়। বিকেল ৩টায় বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে এসে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সমবেত ছাত্রসমাজের উদ্দেশে এক অন্তহীন হুংকার ছেড়ে ঘোষণা দেন যে, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংসদে জরুরি অধিবেশন ডেকে কোটা বৈষম্যের এক দফা দাবি আইন পাসের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত ভুয়া মামলা প্রত্যাহারের জন্য তারা সময়সীমা আরও ২৪ ঘণ্টা বাড়িয়ে দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এই দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে আরও চরম ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সারাদেশে ছাত্রসমাজের একই সুরের গর্জন
ঢাকার এই নাটকীয় আন্দোলনের আঁচ শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং একই সময়ে দেশের প্রতিটি জেলা শহরে জেলা প্রশাসকদের কার্যালয় ঘেরাও করে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি প্রদানের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব সংহতি তৈরি হয়। দুপুর ১টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কাছে তাদের দাবি ও স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন। এদিকে বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আনন্দ মোহন কলেজসহ ময়মনসিংহের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হাজারো তরুণকে সাথে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে হাজির হন।
ঠিক একইভাবে সকাল থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পদযাত্রা নিয়ে শহরের পুলিশ লাইন্স হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রকম্পিত করে তোলে। পিছিয়ে ছিল না ঢাকার অদূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও, যেখানে বেলা সাড়ে ১১টায় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক পুরোপুরি অবরোধ করে সমাবেশ করে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি ব্রজমোহন কলেজ, হাতেম আলী কলেজ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশাল মিছিল নিয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে।
অন্যদিকে কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কারমাইকেল ও সরকারি কলেজের সহস্রাধিক ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে নিজ নিজ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি পৌঁছে দিয়ে প্রমাণ করেন যে, এই লড়াই সমগ্র বাংলার ছাত্রসমাজের।
শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্যে জ্বলল ক্ষোভের আগুন
স্মারকলিপি প্রদানের পর দিনের আলো যখন ফুরিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই বিকেল বেলা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অত্যন্ত বিতর্কিত ও ক্ষোভ উদ্রেককারী এক মন্তব্য ছুড়ে দেন। যেখানে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা চাকরি পাবে?’ এই একটিমাত্র বাক্য মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের আত্মসম্মানে চরম আঘাত হানে।
ঢাবি ক্যাম্পাসে মধ্যরাতের অগ্নিস্ফূলিঙ্গ
রাত ১২টা বাজার সাথে সাথেই যেন এক অলৌকিক ইশারায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। বিশেষ করে রোকেয়া হল, কুয়েত মৈত্রী হল, ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল এবং শামসুন্নাহার হলের ছাত্রীরা হলের ভেতরের প্রধান ফটকের লোহার তালা ভেঙে মধ্যরাতেই প্রথম রাজপথে নেমে আসে। তাদের স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে রাজু ভাস্কর্য চত্বর ও টিএসসি এলাকা। যেখানে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী একই সুরে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘তুমি কে, আমি কে – রাজাকার, রাজাকার’ এবং ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’।
যদিও সেই রাতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন হলের গেটে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, জাগ্রত ছাত্রসমাজের প্রতিরোধের মুখে তাদের সেই চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
একটি দিনলিপির নাটকীয় সমাপ্তি ও এক নতুন ইতিহাসের সূচনা
রাত যখন গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ১টা দেড়টার ঘরে পৌঁছাল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক ও সাহসী আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বুয়েটের শত শত শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে রাজপথে যোগ দেয় এবং পুরো ক্যাম্পাস এলাকা ঘুরে আবার নিজেদের আঙিনায় ফিরে যায়। তবে এই অধিকার আদায়ের রাতের গল্পটা মসৃণ ছিল না। কারণ, রাত সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে, যা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর মাঝেই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে হাইকোর্ট তাদের সরকারি চাকরিতে কোটা বহালের ২৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে, যা তরুণদের আন্দোলনের যৌক্তিকতাকে আরও বেশি ইস্পাতকঠিন করে তোলে।
তৎকালীন সরকারের মন্ত্রীরা যখন এই আন্দোলনকে উসকানিমূলক বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করছিলেন, তখন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তিন দায়িত্বশীল নেতা ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে নিজেদের সংগঠন থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নৈতিক বিজয় নিশ্চিত করেন। ১৪ জুলাইয়ের সকাল যে ব্যারিকেড ভাঙার গান দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা মধ্যরাতের এক পশলা বৃষ্টি আর লক্ষাধিক তরুণের আত্মমর্যাদা রক্ষার স্লোগানের মধ্য দিয়ে নতুন এক বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বীজ বুনে দিয়েছিল।