নীলফামারী: বাংলাদেশে বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্মের পর থেকেই সংগ্রামের আরেক নাম ‘জীবন’। অস্থায়ী ঠিকানা ও তাঁবু ঘরে বড় হতে হতে খুব অল্প বয়সেই শৈশব হারায় দারিদ্র্যের জাঁতাকলে। সমাজের অন্যান্য শিশুদের মতো খেলাধুলা, পড়াশোনা তাদের কাছে বিলাসিতা মাত্র।
এমনই একদল বেদে সম্প্রদায়ের মানুষজন তাদের বাচ্চাদের নিয়ে নীলফামারীর ডোমার উপজেলা পরিষদ মাঠে অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করছেন। বাঁশের চাটাই আর পলিথিন দিয়ে তৈরিকৃত ১১ টি তাঁবুতে থাকছে ৫৫ জন। যাদের মধ্যে ৩০ জনই শিশু।
জানা যায়, এই বেদে সম্প্রদায়ের সবাই নিরক্ষর। এখনকার অনেক শিশু, বাবা-মায়েদের সাপ খেলা দেখাতে ও তাবিজ-ওষুধ বিক্রিতে সাহায্য করে। আবার অনেকে ভিক্ষার বাটি হাতে বিভিন্ন দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়ায়।
প্রতিদিন বাবার সঙ্গে সাপের খেলা দেখাতে যায় ওলিউর। ছোট এ শিশুটি বলে, ‘আমি প্রতিদিন বাবার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সাপের খেলা দেখাই। আমায় অনেক মানুষ বিভিন্ন খারাপ কথা বলে।আমার খুব ইচ্ছা করে খেলাধুলা করার, কিন্তু সাপের খেলা দেখাতে হয় বলে সময় পাইনা।’

নাহিদ ইসলাম আক্ষেপ আর অভিমান নিয়ে বলে, ‘আমারও ইচ্ছা ছিলো পড়াশোনা করার। কিন্তু আমাদের তো কোনো স্থায়ী ঘরবাড়ি নেই। মা-বাবাদের সঙ্গে জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়াই। তাই কখনো স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাইনি।’
আরেক শিশু নদী আক্ষেপ করে বলে, ‘আমি স্কুলে যেতে চাই, কিন্তু যাইতে দেয় না। মা-বাবা বলে, কামাই করতে হবে।’
বাচ্চারা পড়াশোনা পরিবর্তনে কীভাবে পেশায় জড়িয়ে পড়ে, এই বিষয়ে জানতে চাইলে মো. আরমান ইসলাম নামে একজন অভিভাবক জানান, ‘মা-বাবার সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতেই আমরা বাপ-দাদার পেশায় জড়িয়ে পড়েছি। এখন আমরা সাপের খেলা দেখাই ও তাবিজ বিক্রি করে দিন পার করছি। আমরা এক জায়গায় থাকি না, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াই, এজন্য বাচ্চাদের পড়ালেখা শিখাতে পারিনা। যখন আমরা কাজে যাই, তখন বাচ্চাদের তাঁবুতে একা রাখা সম্ভব হয় না। তাই তারা আমাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় আর ঘুরতে ঘুরতে আমাদের পেশা ওরা শিখে ফেলে। শেষমেষ ওরাও আমাদের এই কাজে জড়িয়ে পড়ে।’
তবে এই সম্প্রদায়ের অনেক মা বাবা চায়, তাদের সন্তান যেন জীবনে বড় হয়।

মাজহারুল ইসলাম নামে একজন অভিভাবক বলেন, ‘আমরা বাবা-মায়ের পিছনে ঘুরতে ঘুরতে এই পেশা শিখছি। এখন এই কাজ করেই জীবন নির্বাহ করি। কিন্তু আমাদের বাচ্চারা এখনো ছোট, তাদের তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। যদি সরকার আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করে, তাহলে আমাদের বাচ্চারা কাজ-কর্ম বাদ দিয়ে পড়াশোনা করতে পারতো।’
বেদে শিশুদের প্রসঙ্গে গণমাধ্যম ও মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ন্যাশনাল প্রেস সোসাইটি (এনপিএস) এর রংপুর বিভাগীয় সমন্বয়ক সহিদুল ইসলামের বলেন, ‘বেদে শিশুরা সাধারণত অল্প বয়স থেকেই পরিবার ও সমাজের নানা প্রয়োজনীয়তার কারণে পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায়, তাদের শিক্ষার সুযোগ,স্বাস্থ্য সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে মানসম্পন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। এছাড়াও বেসরকারি এনজিওগুলোকেও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যেন বেদে শিশুদের ভবিষ্যৎ আরও আলোকিত হয়।’