ঢাকা: আগামী সাতদিনের মধ্যে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার না করলে গ্রাহকদের সাপোর্ট সার্ভিস বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি)।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি আমিনুল হাকিম।
একইসঙ্গে ইন্টারনেটকে নাগরিক সেবা ঘোষণার পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের সংশোধনীর দাবিও জানিয়েছেন তিনি। এই সংশোধনীতে ইন্টারনেট খাতের অবকাঠামো রক্ষা করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি), নেটওয়ার্ক, অবকাঠামো ও কর্মীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, দখলবাজির প্রতিবাদে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন এই মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে।

ছবি: সারাবাংলা
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমিনুল হাকিম বলেন, ‘ইন্টারনেট এখন আর বিলাসী পণ্য না। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিটি ব্যাংকের অনলাইন লেনদেন ও এটিএম সেবা ডিজিটাল কানেকটিভিটির সঙ্গে জড়িত। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সরকারি বিভিন্ন ব্যবস্থা এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘২০২০ সালে করোনাকালে ইন্টারনেট খাত মানুষকে নিরলসভাবে সার্ভিস দিয়েছে। কিন্তু কষ্টের বিষয় গত কয়েকমাস ধরে এই সেক্টরের ওপর হামলা, নেটওয়ার্ক দখল, চাঁদাবাজি প্রচুর পরিমাণে বেড়ে গেছে। গত মাসে ধানমন্ডিতে অবস্থিত ডট ইন্টারনেটের অফিসে হামলা হয়েছে এবং এই মাসে চট্টগ্রামে ডিডিএন নেটওয়ার্কের ওপর হামলা করেছে। তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদাও চেয়েছেন এবং চাঁদা না দেওয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। শেষে অফিসে ভাঙচুর করেছে। সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারকে কোনো আল্টিমেটাম দিতে চাই না। সরকারকে আমরা সতর্ক করতে চাচ্ছি, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ যেটা করা হয়েছে, সেটার সংশোধনী জরুরি। সেখানে ইন্টারনেটকে নাগরিক হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি এই ইন্টারনেট খাতের অবকাঠামো রক্ষা করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিরাপত্তা প্রদানের বিধান জরুরি। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, চট্টগ্রামের ব্যাবসাকেন্দ্রে সন্ত্রাসী কাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রেফতার না হলে আমরা ইন্টারনেট সার্ভিসের সাপোর্ট সার্ভিস বন্ধ রাখতে বাধ্য হব।’
আমিনুল হাকিম বলেন, ‘সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে, আপনারা দেখেছেন ইন্টারনেট বন্ধ রাখলে সরকারের পতন কীভাবে হয়? একটা ইন্টারনেট বাংলাদেশের লাইফ লাইন। আমরা চাই না, আপনারা নতুন সরকার, জনগণের সরকার, নতুন জনগণের রোষানলে পড়েন। আমরা জনগণকে সার্ভিস দিচ্ছি, দিন নাই, রাত নাই। আমরা ঝড়ে, বৃষ্টিতে, রোদে পুড়ে সাপোর্ট নিশ্চিত করি। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আমাদের নিরাপত্তা দিতে না পারে, আমরা যদি আশ্বস্ত না হই, স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই প্রত্যেকটা গ্রাহকের সাপোর্ট সার্ভিস বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব।’

ছবি: সারাবাংলা।
আইএসপিএবি-এর মহাসচিব নাজমুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘বর্তমানের সকল কর্মকাণ্ডের মূলে রয়েছে ইন্টারনেট। আর ইন্টারনেট ব্যবসার ওপর যারা আঘাত করতে তারা রাষ্ট্রের শত্রু ও দেশের শত্রু। আমরা এসব সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করতে যদি রাস্তায় নামতে হয়। তবে রাস্তায় নামতে বাধ্য হব। আমাদের দেশের ২৫০০ আইএসপির কর্মকর্তা কর্মচারী স্পষ্ট ভাষায় সরকারকে বলে দিতে চাই, আমাদের রাস্তায় নামাবেন না। আর রাস্তায় নামালে সেটি ভালো কোনো কাজ হবে না। সারা পৃথিবীতে যেভাবে প্রতিটি ইন্টারনেট সেবাকে রাষ্ট্র নিরাপত্তা দেয়, ঠিক আমাদের সরকারকেও তা নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে ইন্টারনেট একটি মৌলিক অধিকার, এটি জনগণের অধিকার। এই অধিকারকে যারা ধ্বংস করতে চাচ্ছেন তাদের সঙ্গে কোনো আপস নয়। মোহাম্মদপুরে ডট ইন্টারনেটের ওপর হামলার কারণে ব্যাংকে লেনদেন বন্ধ ছিল এবং অস্ট্রেলিয়াতে এক শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারেন নাই। অনেকে এটিএম বুথ থেকে টাকা ওঠাতে পারেননি।’
আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামের ঘটনায় জড়িতদের আটক না করলে সংবাদ সম্মেলন করে দেশের মানুষের কাছে বিচার চাওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মানববন্ধনটি পরিচালনা করেন। সেখানে আরও বক্তব্য রাখেন মিজানুর রহমান মিজু, রেজাউল করিম ও মো. রাজন প্রমুখ।
অন্যান্য বক্তারা এই সময়ে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ওপর ধারাবাহিক হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, দখলবাজি ও চাঁদাবাজির ঘটনা শুধু উদ্যোক্তাদের জন্য নয়, বরং লাখ লাখ ইন্টারনেট গ্রাহকের স্বাভাবিক জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, মোবাইল ব্যাংকিং এবং সরকারি ডিজিটাল সেবাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট শুধু একটি বাণিজ্যিক সেবা নয়, এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনের অন্যতম অপরিহার্য অবকাঠামো।

ছবি: সারাবাংলা।
তারা আরও বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত করা যেমন গুরুতর অপরাধ, তেমনি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, চাঁদাবাজি কিংবা নেটওয়ার্ক ধ্বংসের মাধ্যমে জনগণকে ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত করাও সমানভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
মানববন্ধন থেকে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি তুলে ধরা হয়।
দাবিগুলো হলো: ইন্টারনেট অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক, টাওয়ার, আইএসপি অফিস ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, দখলবাজি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষতি করাকে গুরুতর অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, অনলাইন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ই-কমার্স, মোবাইল ব্যাংকিং ও সরকারি ডিজিটাল সেক নির্বিঘ্ন রাখতে ইন্টারনেট অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।