ঢাকা: চৈত্রের দাবদাহ ছাপিয়ে তখন আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘলা আকাশ। বাতাসে থাকার কথা বৃষ্টির গন্ধ। কিন্তু, ’২৪-এর ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল বারুদের গন্ধে। আগের রাতে স্বাধিকারের দাবিতে যে তরুণ বুক চিতিয়ে স্লোগান দিয়েছিল, পরদিন দুপুরে সেই বুকের রক্তে লাল হলো মল চত্বরের ঘাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হলো এক রক্তাক্ত প্রান্তরে, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতার মদদপুষ্ট দানবীয় উল্লাসের সামনে সঁপে দেওয়া হয়েছিল একঝাঁক নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের। সেদিনটি ছিল বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক অন্ধকারতম অধ্যায়ের সূচনা, যা বদলে দিয়েছিল একটি দেশের ইতিহাসের গতিপথ।
কটূক্তি থেকে বিস্ফোরণ
১৫ জুলাইয়ের ট্র্যাজেডির পটভূমি রচিত হয়েছিল আগের দিন বিকেলেই। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে কটূক্তি করেন। সেই অপমান সইতে না পেরে ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী হলগুলোসহ প্রতিটি হলের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসেন। স্লোগান ওঠে ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার!’ তবে এর পরের অংশটি ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক তীব্র চপেটাঘাত – ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার!’ কিন্তু তৎকালীন সরকার এবং তাদের অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলো চতুরতার সঙ্গে স্লোগানের দ্বিতীয় অংশটি চেপে গিয়ে প্রথম অংশটিকেই তাদের হিংস্রতা বৈধ করার অস্ত্র হিসেবে বেছে নেয়।
পরদিন ১৫ জুলাই সকালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, ‘এর জবাব ছাত্রলীগই দেবে।’ ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও হুমকি দেন, আন্দোলনকারীদের শেষ দেখে ছাড়বেন। ওবায়দুল কাদেরের সেই ‘সবুজ সংকেত’ আর সাদ্দাম হোসেনের হুমকি পাওয়ার পর পরই দেশজুড়ে ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী প্রস্তুত হতে শুরু করে। যেন এক শিকারি নেকড়ের দল শিকারের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে বসে ছিল।
বিজয় একাত্তর হল থেকে রক্তের স্রোত
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি থমথমে হয়ে ওঠে। রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জড়ো হতে থাকেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিকেল ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি শান্ত মিছিল যখন বিজয় একাত্তর হলের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখনই শুরু হয় নারকীয় তাণ্ডব। হলের ভেতর ও বাইরে থেকে রড, হকি স্টিক, রামদা এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রলীগ। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথ পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।
হেলমেট পরা ছাত্রলীগ ক্যাডারদের বেপরোয়া মারধরের মুখে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। মল চত্বর, ভিসি চত্বর, শ্যাডো, প্রতিটি কোণ যেন শিক্ষার্থীদের আর্তনাদে কেঁপে ওঠে। বাসের ভেতর আশ্রয় নেওয়া শিক্ষার্থীদেরও টেনেহিঁচড়ে বের করে রক্তাক্ত করা হয়। এক টুকরো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শিক্ষার্থীরা যখন দিগ্বিদিক ছুটছিলেন, তখন চারদিক থেকে ধেয়ে আসছিল রড ও লাঠির আঘাত। রাজপথ রঞ্জিত হতে শুরু করে তাজা রক্তে।
নিরাপদ ছিল না হাসপাতালের করিডোরও
সেদিনের নিষ্ঠুরতা কেবল ক্যাম্পাসের চত্বরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন তাদের রক্তাক্ত বন্ধুদের নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসার জন্য ছোটেন, ছাত্রলীগের হায়েনারা সেখানেও হানা দেয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভেতরে ঢুকে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের ওপর এবং তাদের বাঁচাতে আসা সহপাঠীদের ওপর আরেক দফা বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়।
এমনকি সন্ধ্যার পর শহীদুল্লাহ হলের সামনে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভীতি সঞ্চার করা হয়। রাত গভীর হলে ছাত্রলীগের দানবীয় রূপ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন হলে হলে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন তল্লাশি করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটা আন্দোলনের পক্ষে কোনো পোস্ট বা সমর্থন দেখলেই তাদের ওপর নেমে আসে পাশবিক নির্যাতন। ইডেন মহিলা কলেজের গেটে তালা ঝুলিয়ে সাধারণ ছাত্রীদের আটকে রাখা হয়, চলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে বীর কন্যারা সেদিন তালা ভেঙে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন।
দহন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে, অবরুদ্ধ হয় ক্যাম্পাসগুলো
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রক্তাক্ত খবর যখন দেশের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছায়, তখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো বাংলাদেশ। কিন্তু সর্বত্রই প্রস্তুত ছিল লাঠিয়াল বাহিনী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ জুলাই মধ্যরাত থেকেই বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ১৫ জুলাই রাতেও সেখানে চলে দফায় দফায় হামলা, যার হাত থেকে রেহাই পাননি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করাও। ভয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসভবনে আশ্রয় নিলে সেখানেও হামলা চালানো হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় ছাত্রলীগ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাটাপাহাড় ও শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে চলে রামদার মহড়া। যশোর, খুলনা, কুমিল্লা, দিনাজপুর, দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন সেদিন কেঁপে উঠেছিল দানবীয় বুটের তলায়। তৎকালীন সরকারের মন্ত্রীরা তখনো গণমাধ্যমে দাঁড়িয়ে উল্টো সুর গেয়ে চলেছিলেন, বলছিলেন-‘রাজাকারের পক্ষে স্লোগান রাষ্ট্রবিরোধী’।
প্রতিরোধের নতুন মহাকাব্য
১৫ জুলাইয়ের সেই দীর্ঘ দহনদিনটি কেবল শিক্ষার্থীদের রক্তাক্তই করেনি, বরং তাদের ভেতর থেকে ভয়কে চিরতরে তাড়িয়ে দিয়েছিল। বিকেলে রক্তাক্ত শরীরে দাঁড়িয়ে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেছিলেন, ‘শেখ হাসিনার বক্তব্য আমরা প্রত্যাখ্যান করছি, তাকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে।’ ১৬ জুলাই সারা দেশে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।
সেদিন সূর্যাস্তের পর যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থমথমে অন্ধকার নেমে আসছিল, তখন থোকা থোকা রক্তের দাগ শুকিয়ে যাচ্ছিল পিচঢালা পথে। ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছিল অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ। কিন্তু তারা এসেছিলেন শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে নয়, বরং খুনিদের নিরাপত্তা দিতে। তবে ১৫ জুলাইয়ের সেই রক্তের দাগই যে স্বৈরাচারের পতনের প্রথম স্বাক্ষর ছিল, তা সেদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
যে তরুণদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল, তারা সেদিন বুঝে নিয়েছিলেন, অধিকার আর চেয়ে নয়, ছিনিয়ে নিতে হয়। ক্যাম্পাসের সেই লাল রক্তই পরদিন রূপ নিয়েছিল এক অপ্রতিরোধ্য গণজাগরণে, যা শেষ পর্যন্ত এক নতুন ভোরের দিকে ধাবিত করেছিল পুরো বাংলাদেশকে।