ঢাকা: বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামোর রূপকার, প্রাজ্ঞপ্রাণ প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ৬৩ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ক্ষণজন্মা অসাধারণ মানুষ। তার আরেক পরিচয় হলো- তিনি একজন দেশপ্রেমিক প্রকৌশলী এবং নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনাবিদ। তিনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামোর রূপকার হিসেবে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। প্রকৌশলে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৭ সালে বাংলা একাডেমি থেকে তাকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করা হয়।
কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ১৯৪৫ সালের ২০ জানুয়ারি কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম নূরুল ইসলাম সিদ্দিক এবং মাতা বেগম হামিদা সিদ্দিক। কামরুল এই দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান। তিনি কুষ্টিয়াতে প্রাথমিক ও ১৯৬০ সালে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৬২ সালে কুষ্টিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালে শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ১৯৬৭ সালে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ৩০ এপ্রিল যুদ্ধে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকৌশলী হিসেবে তিনি মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা প্রদানে বিভিন্ন রাস্তা ও সেতুর নকশা প্রণয়ন করে যুদ্ধের অপারেশনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথমে পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির উপ-প্রধান প্রকৌশলী এবং পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়ের আওতায় নগর নির্মাণ কর্মসূচির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী ব্যুরোতে প্রকৌশল উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার পর তিনি প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত সংস্কার সাধন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদফতর (এলজিইডি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি সংস্থাটির প্রধান ছিলেন।
১৯৯৯ থেকে ২০০০ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, ২০০০ সালে যমুনা সেতু ডিভিশন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব, ২০০০ থেকে ২০০১ পর্যন্ত গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বেসরকারীকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান এবং ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৪ মেয়াদে গ্লোবাল ওয়াটার পার্টনারশিপ-দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের চেয়ায়পারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নদীয়া জেলার রানাঘাট ইয়্যুথক্যাম্পের মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণের চিত্রে বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক (সামনে বাম দিক থেকে চতুর্থ)। ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নেওয়া
কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ব্যক্তিগত জীবনে সাবেরা সিদ্দিকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির এক ছেলে এবং তিন কন্যা সন্তান রয়েছে। তিনি শুধু একজন প্রকৌশলী ছিলেন না, ছিলেন একজন যোগ্য ও দক্ষ প্রশাসক। তা জ্বলন্তভাবে প্রমাণ করে গেছেন এলজিইবিকে এলজিইডিতে রূপান্তর করে। এ জন্য তিনি দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
এ দেশের পল্লিভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের নীতিকৌশল ও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করে এক যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচনা করেন। আজকের গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে গতি এসেছে, যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে তা শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের ফলেই সম্ভব হয়েছে। সারা দেশে আজ যে মাইক্রো ক্রেডিটের সুফল দেখা যায়, তা শুধু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের দূরদৃষ্টির ফলে।
গ্রামীণ কৃষকের উৎপাদিত পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সার্ভিস (এমআইএস) চালুর কারণে। জনজীবনের উন্নয়নে অবকাঠামোর যে গুরুত্ব তা কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের অনুধাবন ও অন্তরদৃষ্টির কারণে এলজিইডিকে শূন্য থেকে সফলতার শিখরে নিয়ে গেছেন।
বাংলাদেশে ডিজিটাল শব্দটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেলেও এর বাস্তবায়ন শুরু হয় কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের মাধ্যমে নব্বইয়ের দশকে জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারা দেশের মানচিত্র তৈরির মাধ্যমে। যে মানচিত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে দেশের কোন অঞ্চলে কী ধরনের কাজ করা সম্ভব তা নির্ধারণ করা যায়। আজকের এলজিইডির দৃষ্টিনন্দন ভবন তারই সৃষ্টি।
কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ ও কর্মবীর। তিনি কখনোই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। এলজিইডি, প্রাইভেটাইজেশন, আরবান ট্রান্সপোর্ট, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ সবখানে তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য বিশ্বব্যাংক কামরুল ইসলাম সিদ্দিককে ১৯৯৯ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল রোড ফেডারেশন’ কর্তৃক বর্ষসেরা ব্যক্তি ঘোষণা করা হয়।
তার উল্লেখযোগ্য সম্মাননার মধ্যে রয়েছে- ভাসানী স্বর্ণপদক (১৯৯৫), কবি জসীম উদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৯৫), আইইবি স্বর্ণপদক (১৯৯৮), সিআর দাস স্বর্ণপদক (১৯৯৯), আব্বাস উদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৯৯), শেরেবাংলা স্বর্ণপদক (২০০০), বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী স্বর্ণপদক (২০০০), জাইকা মেরিট অ্যাওয়ার্ড (২০০০), যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ফেলোশিপ এবং বাংলা একাডেমি ফেলো (২০০৭)।