ঢাকা: প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ক্ষমতার মসনদ থেকে রাজপথের আন্দোলন, নির্বাচনে বিজয় থেকে রাজনৈতিক সংকট—দীর্ঘ এই পথচলায় দলটি যেমন রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, তেমনি মোকাবিলা করেছে নানা প্রতিকূলতা। প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর ২০২৬ সালে ফের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসেছে বিএনপি। ফলে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির জন্য শুধু অতীত স্মরণের নয়, বরং নতুন বাস্তবতায় নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দলটি অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে বিএনপি।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার সময় বিএনপির সরকার গঠন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, একই বছরের জুনের নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতি নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করে। শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বড় জয় নিয়ে আবারও সরকার গঠন করে দলটি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার দেশ পরিচালনা করে। এটিই ছিল বিএনপির সর্বশেষ পূর্ণ মেয়াদের সরকার।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়। ২০০৭ সালে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতার বাইরে চলে যায় দলটি। ২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় সরকারে থাকায় বিএনপিকে রাজপথের আন্দোলন, নির্বাচন ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের দাবিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় মাঠে থাকতে হয়।
২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপির রাজনীতিতে আরেকটি বড় বাঁক তৈরি করে। নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর দলটি সংসদের বাইরে চলে যায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও প্রত্যাশিত ফল পায়নি বিএনপি। এর পরের সময় দলটির আন্দোলনের প্রধান দাবির মধ্যে ছিল নিরপেক্ষ নির্বাচন, রাজনৈতিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের এই সময়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং পরে অসুস্থতার বিষয়টি বিএনপির রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে ওঠে। একই সময়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে থাকে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সংগঠনকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলনের রাজনীতি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। এরপর ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দলটির রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে—দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির পর আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় দলটি। ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির ক্ষমতায় ফেরাকে প্রায় দুই দশক পর দলের প্রত্যাবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ক্ষমতায় ফেরার পর বিএনপির রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলে গেছে। এতদিন যে দল জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি দাবি করত, এখন সেই দলকেই জনগণের কাছে নিজেদের কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে হচ্ছে। বিরোধী দলের আন্দোলনের ভাষা থেকে সরকার পরিচালনার বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে বিএনপি।
এ কারণেই ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। পাঁচ দিনের কর্মসূচিতে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, প্রতিষ্ঠাতা শহিদ জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা, আলোচনা সভার পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণের মতো কর্মসূচিও রাখা হয়েছে।
তবে ক্ষমতায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির সামনে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের প্রত্যাশা। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতিতে গতি ফেরানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা—এসব এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করাও বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটি বড় অংশ। দলটির জন্ম হয়েছিল এক ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়; এরপর সময়ের সঙ্গে দলটি বিরোধীদল, সরকার এবং আবার বিরোধীদলের ভূমিকায় গেছে। এখন আবার সরকারে। ফলে আগামী দিনের বিএনপি কতটা কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে, সেটিই হবে দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বড় পরীক্ষা।
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই বিএনপির সামনে অতীতের সাফল্য ও সংগ্রামের স্মৃতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নতুন দায়িত্বের কঠিন বাস্তবতা। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে দলটি যে সুযোগ পেয়েছে, সেটিকে কতটা জনকল্যাণে কাজে লাগাতে পারে—শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির পরবর্তী অধ্যায়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপি দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ক্ষমতায় থেকেও যেমন জনগণের জন্য কাজ করেছে, তেমনি বিরোধীদলে থেকেও রাজপথে সংগ্রাম করেছে। দীর্ঘ প্রতিকূলতা ও আন্দোলন-সংগ্রামের পর জনগণের রায়ে বিএনপি আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। এখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’