Saturday 18 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

নির্মাণের ৩০ বছরেও চালু হয়নি রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৮ জুলাই ২০২৬ ১০:৪৬ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ ১০:৪৮

দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল।

রাজবাড়ী: নির্মাণের ৩০ বছর পার হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় টার্মিনালের ভবন, আসবাবপত্র ও অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এটি যাত্রীসেবার বদলে বাস ও ট্রাক গ্যারেজ ও বিভিন্ন যানবাহন মেরামতের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর মাদকসেবীদের আড্ডাস্থল হয়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে।

রাজবাড়ী বাস মালিক ও শ্রমিক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থান এবং পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ার কারণে বাস মালিকরা টার্মিনাল ব্যবহার করতে আগ্রহী নন। কয়েক দফা চালু করা হয়েও তা স্থায়ী হয়নি।

বিজ্ঞাপন

রাজবাড়ীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের শ্রীপুরে অবস্থিত। সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম না থাকায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে টার্মিনাল। সেখানে যাত্রীদের কোনো আনাগোনা নেই। টার্মিনালের মূল ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে জমজমাটভাবে চলছে চলছে বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন মেরামতের গ্যারেজগুলো। যত্রতত্র পড়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। জমে রয়েছে পানি। টার্মিনালের মূল ভবনের একপাশে যাত্রীদের বসার স্থান থাকলেও চেয়ারগুলো ভেঙে যাওয়ায় তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ব্যবহৃত হয় না ভবনের কোনো রুম। দু-একটি রুম ব্যবহৃত হলেও সেগুলোতে যানবাহন মেরামতের যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অযত্নের কারণে টার্মিনাল ভবনের কক্ষগুলোর দরজা জানালা ভেঙ্গে গেছে, খসে পড়েছে পলেস্তারা। মূল ভবনে বিভিন্ন অংশে ধরেছে ফাটল। টয়লেট থাকলেও পানি নেই, অপরিষ্কার।

রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভা থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে সংগঠনটি শহরের মুরগির ফার্ম এলাকায় বাস রাখার ব্যবস্থা করেছে। সেখানে প্রতিটি বাস থেকে পার্কিং চার্জ বাবদ ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়। বাস টার্মিনাল ব্যবহারের জন্য সংগঠনটি পৌরসভা থেকে ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ টাকায় বন্দোবস্ত নিয়েছে।

রাজবাড়ী জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২-৯৩ অর্থ বছরে শহরের শ্রীপুর এলাকায় প্রায় ৪ একর ১৪ শতাংশ জমির ওপর ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৪ সালের ১৯ এপ্রিল তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহানারা বেগম টার্মিনালটির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর কিছুদিন চালু থাকলেও পরে বন্ধ হয়ে যায়। ২০০০ সালে এটি রাজবাড়ী পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পুনরায় চালু হলেও ২০০৯ সালে আবার বন্ধ হয়ে যায়। চুক্তি অনুযায়ী, নির্মাণ ব্যয়ের অর্থ ধাপে ধাপে জেলা পরিষদকে পরিশোধ করার কথা থাকলেও পৌরসভা এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। বর্তমানে জেলা পরিষদের পাওনা রয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অন্যদিকে পৌরসভা টার্মিনাল ইজারা এবং সংলগ্ন মার্কেট থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে।

টার্মিনাল বন্ধ থাকায় বর্তমানে রাজবাড়ী শহরের মুরগির ফার্ম (নতুন বাজার), বড়পুল ও মালিক গ্রুপের অফিসের সামনে মহাসড়ক থেকেই যাত্রী ওঠানামা করছে। এতে প্রতিনিয়ত যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দা ছামাদ গাজী বলেন, ‘সরকার কোটি টাকা খরচ করেছে, কিন্তু টার্মিনাল চালু না হলে সেই অর্থের কোনো মূল্য থাকে না। বাস টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় মুরগির ফার্ম, বড়পুল ও বাস মালিক গ্রুপের অফিসের সামনে মহাসড়কের ওপর গাড়ি পার্কিং করে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এতে যানজট সৃষ্টির পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। আমরা চাই বাস টার্মিনালটি চালু করা হোক। এতে যাত্রীরাও সুবিধা পাবে। টার্মিনাল চালু হলে রাজবাড়ীবাসী উপকৃত হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, ‘পরিত্যক্ত থাকায় সন্ধ্যার পর টার্মিনালটি মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়।’

কৃষ্ণ হালদার নামের এক বাস চালক বলেন, ‘আমরাও চাই টার্মিনালটা প্রাণ ফিরে পাক। কিন্তু শহর থেকে টার্মিনালটা দূরে হওয়ার কারনে যাত্রীরা এখানে আসতে চাননা। তবে ছোট-বড় সব গাড়ি অটো, মাহিন্দ্র যদি টার্মিনালে হোল্ড করে তবে টার্মিনালটা চালু হবে, যাত্রী উঠানামা করা যাবে। তবে টার্মিনালে যাত্রী উঠানামা ছাড়া সবই হচ্ছে। রাতে এখানে সব বাস থাকে। সকাল হলে আবার টিপে চলে যায়।’

জামাল বিশ্বাস নামের বাসের এক সুপারভাইজার বলেন, ‘যাত্রীরা হলো সুবিধাবাদী জিন্দাবাদ। দূরে হওয়ায় তারা চান না টার্মিনালে আসতে। বেশির ভাগ যাত্রী মুরগী ফার্ম ও বড়পুল থেকে উঠার চেষ্টা করে। তবে টার্মিনাল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে আবার চালু করা হোক। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত থাকায় টার্মিনালের ভবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ও আশপাশের পরিবেশ নোংরা হয়ে যাচ্ছে।’

রাজবাড়ী সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার ভৌমিক বলেন, ‘টার্মিনালটি অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। টার্মিনালের দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে মেরামত করা হয়নি। টার্মিনালে দুটো প্রবেশপথ ভালো না। এবার ইজারা নেওয়ার সময় পৌরসভাকে ঠিক করতে বলা হলেও তারা ঠিক করেনি। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি শহর থেকে একটু দূরে হওয়ায় যাত্রীরা এখানে নামতে বা যানবাহনে উঠতে চায় না। তবে টার্মিনালে রাতে বাস রাখা হয়। টার্মিনালটি পুরোপুরি চালুর জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি এবং আমরা মালিকরা নিজেরাও বসে মিটিং করেছি।’

রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক কল্যাণ চৌধুরী জানান, জেলা পরিষদের বকেয়া অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হচ্ছে। বাস টার্মিনাল পুনরায় চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, ‘পৌরসভা দীর্ঘদিন ধরে চুক্তির শর্ত পূরণ করেনি। ৩০ বছরেও বাস টার্মিনাল চালু করতে না পারায় মূল্যবান এ জমি এখন বাসের গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। এর কোনো যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। ওই জমিটির সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরী। একটি অংশে বাস টার্মিনাল রাখা যেতে পারে। তবে অপর অংশে এক হাজার আসন বিশিষ্ট জেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম ও জেলা কালেক্টরেট স্কুল নির্মাণের অনুরোধ জানিয়েছেন। অডিটোরিয়াম নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যেই স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এক কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।’

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর