Sunday 06 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ঢামেকে লাখ লাখ টাকার ‘আইসিইউ’ ব্যবসা, জড়িত আনসার সদস্যরা

সোহেল রানা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৩২

ঢাকা মেডিকেল কলেজের আইসিইউ। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: দেশের অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল। প্রতিদিন হাজারো রোগী ও স্বজনের ভিড় থাকে এই হাসপাতালে। কিন্তু রোগীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালনকারী কিছু আনসার সদস্যের বিরুদ্ধেই উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। চাঁদাবাজি, দালাল ও অপরাধী চক্রকে সহযোগিতা এবং সুবিধাজনক ওয়ার্ডে দায়িত্ব পেতে অর্থ লেনদেনসহ আইসিইউ ব্যবসার মতো— এমন অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, কিছু আনসার সদস্যই এখন হাসপাতালের ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে উঠেছেন। তবে, তাদের এসব দুর্নীতির বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছেন আনসার প্লাটুন কমান্ডার (পিসি)।

বিজ্ঞাপন

আইসিইউ বেডের নামে অন্য ক্লিনিকে পাঠানো হয় রোগী

সম্প্রতি ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনের চতুর্থ তলায় আইসিইউর সামনে দায়িত্ব পালনরত আনসার সদস্য মহসিনের সঙ্গে কথা হয় সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের। প্রতিবেদক রোগীর স্বজন পরিচয়ে আইসিইউতে একটি শয্যার ব্যবস্থা করার বিষয়ে জানতে চান। মহসিন তখন বলেন, ‘এখানে বেড পাওয়া এত সহজ না। ওপর লেভেলে লোক থাকতে হয়। তাছাড়া ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি অনেক রোগী সিরিয়ালে থাকে।’

এরপর প্রতিবেদক জানান, তার রোগী উত্তরার একটি হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি আছেন। সেখানে প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। কম খরচে ঢামেকে আইসিইউয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া সম্ভব কি না, জানতে চাওয়া হয়। এ সময় আনসার সদস্য মহসিন একটি মোবাইল নম্বর বের করে বলেন, ‘আমার কাছে একজনের নম্বর আছে। আগে আমি ভিতর থেকে তার সঙ্গে কথা বলে আসি।’

এরপর তিনি আইসিইউর ভেতরে গিয়ে একজনের সঙ্গে কথা বলেন এবং ফিরে এসে একটি নম্বরে ফোন দিতে বলেন। সেই নম্বরে ফোন দিলে ইমরান নামের একজন ফোন রিসিভ করেন। তিনি জানান, ধানমন্ডি ‘টুয়েন্টি সেভেন’ নামে তাদের একটি ক্লিনিক রয়েছে। সেখানে রোগী নিয়ে গেলে তুলনামূলক কম খরচে ভর্তি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে।

অভিযোগ রয়েছে, এভাবেই ঢামেকের কিছু আনসার সদস্য সরাসরি আইসিইউ ও বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার রোগী সরানোর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

সিএনজিচালকদের কাছ থেকে চাঁদা

হাসপাতালে কর্মরত কয়েকজনের অভিযোগ, জরুরি বিভাগের সামনে রোগী নিয়ে কোনো সিএনজি অটোরিকশা গেলেই দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার সদস্যকে ২০ টাকা দিতে হয়। শুধু তা-ই নয়, আনসারদের যোগসাজশে বহিরাগত দালাল, চোর ও বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীও হাসপাতালের ভেতরে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করার সুযোগ পান। এছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিয়মিত মোবাইল ফোন চুরির ঘটনাও ঘটে। কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার অভিযোগ, এসব চুরির সঙ্গে আনসার সদস্যদের একটি অংশের যোগসাজশ রয়েছে। তাদের দাবি, সাধারণ রোগী ও স্বজনদের অনেক সময় নানা অজুহাতে বাধা দেওয়া হলেও দালাল ও বহিরাগত অপরাধীরা সহজেই হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতে পারেন। তাছাড়া, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ১০ থেকে ১৫ জন করে ভ্রাম্যমাণ কফি বিক্রেতা ব্যবসা করেন। আনসারদের টহল দলের সদস্যদের টাকা দিয়েই তারা এই সুযোগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

পছন্দের ওয়ার্ডে ডিউটি পেতে দিতে হয় টাকা

ঢাকা মেডিকেলে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আনসার সদস্য জানান, সুবিধাজনক ওয়ার্ডে দায়িত্ব পেতে তাদের প্লাটুন কমান্ডারকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়। এমনকি প্রাপ্য ছুটি পেতেও অর্থ গুনতে হয় বলে অভিযোগ তাদের। তাদের ভাষ্য, আনসার সদস্যদের পোস্টিং ও পছন্দের শাখায় দায়িত্ব পালনের সুবিধা দিয়ে প্রতি সপ্তাহে লাখ লাখ টাকা আদায় করেন পিসি। পিসিকে দেওয়া এই টাকার একটি অংশ সাধারণ আনসার সদস্যরা হাসপাতালকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধী চক্রের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থের উৎস হিসেবে তারা হাসপাতালের ওষুধ চোর চক্র, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল ও বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের ব্যবহার করেন।

২১১ ও ২১২ নম্বর ওয়ার্ডে ডিউটির ‘রেট’ সবচেয়ে বেশি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালের যেসব ওয়ার্ডে দালাল, বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রক্ত বা প্যাথলজিক্যাল স্যাম্পল সংগ্রহকারী, ওষুধ চোর, ‘স্পেশাল বুয়া’, বহিরাগত ট্রলিম্যান, বহিরাগত হুইলচেয়ারধারী, রোগীদের বারান্দা ও সিঁড়িতে বিশেষ বিছানা করে দেওয়া ব্যক্তি, অ্যাম্বুলেন্সের দালাল ও সাধারণ চোরদের আনাগোনা বেশি, সেসব জায়গাতেই আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালনের আগ্রহ বেশি।

কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এসব ব্যক্তি ও চক্রের কাছ থেকে দৈনিক বা মাসোহারা ভিত্তিতে টাকা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। হাসপাতালের ২১১ নম্বর ওয়ার্ড শিশু এনআইসিইউ ও নবজাতকদের (নিওনেটোলজি বিভাগ) জন্য বরাদ্দ। ২১২ নম্বর ওয়ার্ড গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের। এই দুই ওয়ার্ডে ডিউটি নিতে হলে আনসার সদস্যদের প্রতি সপ্তাহে ‘এ’ শিফটে ৪০ হাজার টাকা, ‘বি’ শিফটে ৩২ হাজার টাকা এবং ‘সি’ শিফটে ৪৫ হাজার টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এক্স-রে ইউনিটে দায়িত্ব নিতে ‘এ’ ও ‘বি’ শিফটে সপ্তাহে ৭ হাজার টাকা করে এবং ‘সি’ শিফটে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়। সিটি স্ক্যান ইউনিটে ‘এ’ শিফটে ৪ হাজার, ‘বি’ শিফটে ৪ হাজার এবং ‘সি’ শিফটে ২ হাজার টাকা ও প্যাথলজি বিভাগে দায়িত্ব পেতে ‘এ’ শিফটের জন্য প্রতি সপ্তাহে ৬ হাজার, ‘বি’ শিফটে ৪ হাজার এবং ‘সি’ শিফটে ২ হাজার টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দালালদের ‘রোগী শিকারে’ সহায়তার অভিযোগ

হাসপাতাল গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল এখানে ব্যাপকভাবে সক্রিয়। তাদেরকে হাসপাতালে নির্বিঘ্নে রোগী শিকারের কাজের সুযোগ দিতে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন পিসি। শুধু তা-ই নয়, দালালদের প্ররোচনায় ২১১ ও ২১২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেন তারা। এমনকি কোন চোর বা দালাল ধরলে সরাসরি হাসপাতালের তৃতীয় তলায় তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তার কাছে কিছু পাওয়া গেলে সেখান থেকেই ছেড়ে দেয়। কিছু না পাওয়া গেলে পুলিশ ক্যাম্পে জমা দিয়ে যায়। এমনকি চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলেও আনসার সদস্যদের নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানেন না পিসি

অভিযোগের বিষয়ে ঢামেক হাসপাতালের আনসার প্লাটুন কমান্ডার (পিসি) মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এগুলোর আমি কিছু জানি না। আমার দায়িত্বকাল কয়েক মাস। এর মধ্যে অনেক দালাল ও মোবাইল চোর ধরা হয়েছে। তাদের সরাসরি পুলিশ ক্যাম্পে দিয়ে দেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে হাসপাতালের বহিরাগত হুইলচেয়ার দালাল ও বিভিন্ন ওয়ার্ডে থাকা স্পেশাল আয়া বের করে দেওয়া হয়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর টাকা নিয়ে আনসারদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডিউটি দেওয়া হয় না। আগে ছিল কি না, আমার জানা নেই।’

যা বলছেন ঢামেক পরিচালক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আনসার সদস্যদের কাজ আগে থেকে অনেকটাই ঢিলেঢালা হয়ে গেছে। তবে তাদের ছাড়া হাসপাতালও চলবে না। আনসার পিসিদের ছয় মাস পরপর বদলি হয়। আনসারদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের কার্যক্রম ও রোগীর চাপ আগের তুলনায় বেড়েছে। রক্ত পরীক্ষা ও আলট্রাসনোগ্রামের জন্য বহির্বিভাগে আলাদা কক্ষ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন রোগের জন্য আলাদা টিকিট কাউন্টার চালু করা হয়েছে। হাসপাতালে জায়গা ও বেডের তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। এর মধ্যে দুয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সোহেল রানা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর