ঢাকা: ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) চিহ্নিত ৬১টি শুল্কবহির্ভূত বাণিজ্য বাধার মধ্যে ৪৮টির সমাধান করেছে বাংলাদেশ। অবশিষ্ট বাধাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি বাজার ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি নিয়ে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা শুরুর পথে অগ্রগতি হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব তথ্য জানান।
ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশন মাইকেল মিলার, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত মার্চে ইইউ রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান কিছু প্রতিবন্ধকতার বিষয় তুলে ধরে। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুততার সঙ্গে এসব সমস্যার বড় অংশের সমাধান করা হয়েছে।
সমাধান হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিক কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, বাণিজ্যিক স্যাম্পল আমদানির বার্ষিক সীমা ১০ হাজার মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলারে উন্নীত করা এবং রফতানি পণ্যের ট্রেসিবিলিটি নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত স্ক্যানিং স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন জটিলতা দূর করার বিষয় রয়েছে।
বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) সুপারিশ ইতিবাচকভাবে এসেছে। আগামী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শক্তিশালী সমর্থন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়ার পর ইউরোপীয় কমিশন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইইউ’র সদস্য দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হলে চলতি সপ্তাহ থেকেই এ বিষয়ে যৌথ কারিগরি আলোচনা শুরু হতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ইইউর অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হলে উভয় পক্ষই লাভবান হবে।
এ সময় বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিমান চলাচল ও বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে এয়ারবাস ক্রয়সংক্রান্ত আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানির বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সবসময় জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে আমদানি সিদ্ধান্ত নেয়।
তিনি বলেন, জ্বালানি, বিশেষ করে এলএনজি এবং খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, পণ্যের গুণগত মান ও অপচয়ের হার বিশ্লেষণ করে সরকারি ক্রয় কমিটি সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে।
বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রভাব দ্বারা পরিচালিত নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণই সব সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য বাধা কমানো এবং এফটিএ আলোচনার উদ্যোগকে দেশের রফতানি ও বিনিয়োগ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে এর মাধ্যমে নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।