বাংলাদেশের সঙ্গীত আকাশের এক অমলিন ও দীপ্তিমান নক্ষত্র ফকির আলমগীর। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে শব্দ আর সুরকে অস্ত্র করে তিনি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন কোটি জনতাকে, জাগ্রত করেছিলেন মুক্তিকামী মানুষের সুপ্ত চেতনা। ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মহীয়সী শিল্পী শৈশব থেকেই পলিমাটির সুবাস ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের সাথে গভীরভাবে পরিচিত ছিলেন। গানের মধ্য দিয়ে গণমানুষের দুঃখ, কষ্ট, ক্ষোভ ও অধিকারের বাণী ফুটিয়ে তোলাই ছিল তার সঙ্গীতের মূল সুর। ষাটের দশকে ছাত্র ইউনিয়নের হাত ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পা রাখা ফকির আলমগীর নিজের সৃষ্টিশীলতা ও অসামান্য কণ্ঠের জাদুতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বাংলার আপামর জনতার নিজস্ব শিল্পী হিসেবে। গণমানুষের সঙ্গীতকে মূলধারায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তার অবদান বাংলা সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে ফকির আলমগীর কেবল দেশাত্মবোধক ও বিপ্লবী গানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সাথে দেশীয় লোকজ সুরের এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পপ ও গণসংগীতের নতুন ধারা। ১৯৭৫ সাল-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ গঠনে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তার কণ্ঠে ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে’, ‘নাম তার ছিল জন হেনরি’, ‘নেলসন ম্যান্ডেলা’, ‘শান্তিচুক্তি’ কিংবা ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’-র মতো গানগুলো যুগে যুগে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে এবং নতুন প্রজন্মকে করেছে অনুপ্রাণিত। সঙ্গীতের পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চা, গবেষণা ও লেখালেখিতেও তার বিচরণ ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও তথ্যসমৃদ্ধ। তিনি নিয়মিত দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিক ও সাময়িকীতে নিবন্ধ লিখেছেন এবং গণসংগীতের ইতিহাস নিয়ে একাধিক মূল্যবান গবেষণা গ্রন্থ রচনা করে গেছেন, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতিপ্রেমী ও তরুণ গবেষকদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এ ছাড়া তিনি শেরেবাংলা পদক, বিএসআরএ পদকসহ দেশে-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মের হাজারো উদীয়মান শিল্পীকে সাংস্কৃতিক চর্চার মূলধারায় যুক্ত করেছিলেন। ২০২১ সালের ২৩ জুলাই মহামারী করোনায় আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন এই কালজয়ী লোকনায়ক। জীবদ্দশায় তিনি যে অদম্য সাহসিকতা, মেহনতী মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সুরের মূর্ছনা রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয় সংকট ও উৎসব-আনন্দে এ দেশের মানুষকে যুগ যুগ ধরে একতাবদ্ধ হওয়ার শক্তি জুগিয়ে যাবে।