চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম প্রভাববিস্তারী ও নিখুঁত চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও প্রযোজক স্ট্যানলি কুবরিক। ১৯২৮ সালের ২৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের ব্রঙ্কসে জন্মগ্রহণ করেন এই বিস্ময়কর সিনেমা রূপকার। শৈশবে সাধারণ পাঠ্যপুস্তক কিংবা প্রথাগত স্কুলের লেখাপড়ায় খুব একটা মন না থাকলেও বাবার হাত ধরে মাত্র ১২ বছর বয়সে পাওয়া দাবা খেলা এবং ১৩ বছর বয়সে হাতে আসা একটি ক্যামেরা তার জীবন ভাবনাকে আমূল বদলে দেয়। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং ক্যামেরা ফোকাসের সেই নিখুঁত দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিখ্যাত ‘লুক’ ম্যাগাজিনে আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে স্থিরচিত্রের চৌকাঠ পেরিয়ে সময়ের সাথে সাথে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন চলচ্চিত্র নির্মাণের এক সম্পূর্ণ নতুন এবং আপসহীন ধারায়, যা বিশ শতকের বিশ্বচলচ্চিত্রকে দিয়েছিল নতুন দিকনির্দেশনা।
নিখুঁত দৃশ্যধারণ এবং চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত এই মাস্টারমাইন্ড পরিচালক প্রথম বিশ্বকে তাক লাগিয়েছিলেন ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কিলিং’ এবং ১৯৫৭ সালের যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র ‘প্যাথস অব গ্লোরি’ দিয়ে। পরবর্তীতে মহাকাব্যিক ‘স্পার্টাকাস’ এবং বিতর্কিত কিন্তু যুগান্তকারী ‘ললিতা’ কিংবা রোমাঞ্চকর ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হলিউডে নিজের অবস্থানকে অবিশ্বাস্য উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি। তবে ১৯৬৮ সালে মুক্তি পাওয়া কালজয়ী বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ঘরানার সিনেমা ‘২০০১: আ স্পেস অডিসি’ বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক বিরাট ইতিহাস সৃষ্টি করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ অভিযান এবং মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ দৃশ্যমান প্রভাব ক্যাটাগরিতে অ্যাকাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন। পরবর্তীতে ‘আ ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ’, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ‘ব্যারি লিন্ডন’, সাইকোলজিক্যাল হররধর্মী ‘দ্য শাইনিং’ এবং যুদ্ধনির্ভর ‘ফুল মেটাল জ্যাকেট’-এর মতো বিশ্ববিদিত চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে নিজেকে চলচ্চিত্রের অনন্য শিখরে উন্নীত করেন তিনি।
নিজের প্রতিটি চলচ্চিত্রে শতভাগ নিখুঁত কাজ ফুটিয়ে তুলতে তিনি একটানা একই দৃশ্য অসংখ্যবার শ্যুট করার জন্য বিশ্বজুড়ে আলোচিত ছিলেন। জীবনের শেষ সিনেমা ‘আইজ ওয়াইড শাট’-এর কাজ সম্পন্ন করার কিছুদিন পরই ১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ ৭০ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই মহান সিনেমা কারিগর। চার দশকের ক্যারিয়ারে মাত্র ১৩টি পূর্নাঙ্গ ফিচার চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও চলচ্চিত্রে নতুন কৌশল, ক্যামেরার কাজ, অসাধারণ সুরের মেলবন্ধন এবং গভীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করে তিনি আজও সমকালীন চলচ্চিত্র জগতে এবং কোটি সিনেমা প্রেমীর হৃদয়ে এক অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে বেঁচে আছেন। জাদুকরী সেই সৃষ্টির স্মৃতিতে প্রয়াণের এত বছর পরও তার শুভ জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছেন এই মহানায়ককে।