বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাববিস্তারী ব্যান্ড ‘মাইলস’-এর মূল কণ্ঠশিল্পী এবং বেজ গিটারিস্ট শাফিন আহমেদ। নব্বইয়ের দশকের বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের স্বর্ণযুগ গড়তে এবং তরুণ প্রজন্মকে সুরের দোলায় মাতাতে তার অবদান অতুলনীয়। ১৯৬১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহ্যবাহী সুরসাধক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই কালজয়ী সঙ্গীতশিল্পী। তার বাবা দেশের বিখ্যাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকার কমল দাশগুপ্ত এবং মা নজরুলসংগীতের প্রখ্যাত সম্রাজ্ঞী ফিরোজা বেগম। পারিবারিক সূত্রে রক্তে সঙ্গীতের তাল-লয় নিয়ে বেড়ে ওঠা শাফিন আহমেদ শৈশব থেকেই ওয়েস্টার্ন রক, পপ এবং আধুনিক সুরাঙ্গকে নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে পড়াশোনাকালীন সুযোগ পান বৈশ্বিক সঙ্গীতচর্চাকে কাছ থেকে অনুধাবন করার, যা তার পরবর্তী মিউজিক্যাল ক্যারিয়ার ও পরিবেশনশৈলীতে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিল।
১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করা ব্যান্ড ‘মাইলস’-এ শাফিন আহমেদ যুক্ত হন আশির দশকের গোড়ার দিকে। সময়ের পরিক্রমায় কেবল দেশে নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা মেলোডিয়াস রক ব্যান্ড হিসেবে মাইলসকে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে তার গায়কী, বেজ গিটারের জাদু এবং শক্তিশালী উপস্থিতি প্রধান ভূমিকা পালন করে। তার সুরেলা ও দরদী কণ্ঠে ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘ধাঁধার চেয়েও জটিল’, ‘চাঁদ তারা সূর্য’, ‘কোটি বছর আশায় ছিলাম’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘নীলা’, ‘হৃদয়হীনা’ কিংবা ‘পাহাড়ি মেয়ে’-র মতো অসংখ্য কালজয়ী গান আজও বাঙালির আড্ডা, সুখ-দুঃখ এবং স্মৃতির ক্যানভাসে অমলিন হয়ে আছে। মাইলসের প্রথম দিকের ইংরেজি অ্যালবাম থেকে শুরু করে ‘প্রতীক্ষা’, ‘প্রত্যাশা’, ‘প্রত্যয়’ ও ‘প্রবর্তনা’-র মতো প্রতিটি বাংলা অ্যালবামই শ্রোতাদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব ভালোবাসা কুড়িয়েছে। মেলোডিয়াস রক সঙ্গীতের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী সুরের অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়ে তিনি বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।
ব্যান্ড সঙ্গীতের পাশাপাশি শাফিন আহমেদ বেশ কিছু একক অ্যালবাম ও একক গান প্রকাশ করেছিলেন, যা তার স্বাতন্ত্র্যময় গায়কীকে প্রকাশ করে। গানের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও তিনি নিজেকে তুলে ধরেছিলেন। ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। তার অসময়িক প্রয়াণ বাংলা সঙ্গীত অঙ্গনে এক অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে। প্রয়াণ দিবসের এই বিষাদময় ক্ষণে দেশের কোটি কোটি সুরপ্রেমী পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছেন বাংলা ব্যান্ডের এই মহান রাজপুত্রকে, যিনি তার সুর, কণ্ঠ এবং গিটারের ছন্দে প্রতিটি সঙ্গীতপ্রেমী বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল বাঁচবেন।