বিশ্ব বিনোদন ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘকায় ও প্রভাববিস্তারী কৌতুক অভিনেতা, গায়ক, নৃত্যশিল্পী এবং প্রযোজক বব হোপ। ১৯০৩ সালের ২৯ মে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা এই মহাতারকা শৈশবেই পরিবারের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে বেড়ে ওঠেন। বিনোদন জগতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরির অদম্য ইচ্ছা থেকে তিনি খুব অল্প বয়সেই নাচ এবং কৌতুক অভিনয়ের মাধ্যমে মঞ্চে পারফর্ম করা শুরু করেন। সময়ের সাথে সাথে ব্রডওয়ে থিয়েটার, রেডিও, রূপালী পর্দা এবং পরবর্তীতে উদীয়মান টেলিভিশন মাধ্যমে নিজের স্বাতন্ত্র্যময় উপস্থিতি ও নিখুঁত টাইমিংয়ের জোরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হাসির উৎসে পরিণত হন। দীর্ঘ প্রায় আট দশক ধরে বিনোদন জগতের প্রায় প্রতিটি মাধ্যমে তিনি যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
হলিউডের রূপালী পর্দায় বব হোপের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় ছিল খ্যাতিমান অভিনেতা ও গায়ক বিং ক্রসবি এবং অভিনেত্রী ডরোথি ল্যামুরের সাথে অভিনীত ঐতিহাসিক ‘রোড টু…’ চলচ্চিত্র সিরিজ। ‘রোড টু সিঙ্গাপুর’, ‘রোড টু মরক্কো’ কিংবা ‘রোড টু বালির’ মতো এই সিরিজের কমেডি ছবিগুলো তৎকালীন বিশ্ব চলচ্চিত্রে বক্স অফিসে নতুন রেকর্ডের জন্ম দিয়েছিল। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের বাইরেও অ্যাকাডেমি পুরষ্কার বা অস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তার ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে তিনি রেকর্ড ১৯ বার অস্কারের জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চ পরিচালনা ও সঞ্চালনা করেন, যা আজও অস্কারের ইতিহাসে একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে আছে। অভিনয়ের পাশাপাশি তার চমৎকার বাচনভঙ্গি এবং হাস্যরসাত্মক সংলাপ উপস্থাপন তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় মার্কিন আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
কেবল পেশাদার বিনোদন জগতেই নয়, মানবসেবা ও মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সৈন্যদের বিনোদন জোগাতে তার অবদান ছিল সবচেয়ে প্রশংসনীয়। ইউএসও (ইউনাইটেড সার্ভিস অর্গানাইজেশন্স)-এর অধীনে বিশ্বযুদ্ধের কঠিন সময় থেকে শুরু করে চার দশক ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের রণক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেনাদের হাসিয়েছেন ও সাহস যুগিয়েছেন। এই মানবতাবাদী ও বিনোদনমূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ এবং ‘কনগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল’-এ ভূষিত হন। ২০০৩ সালের ২৭ জুলাই শতবর্ষী এই মহান শিল্পী ক্যালিফোর্নিয়ার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুদিবসের এই বিষাদময় ক্ষণে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত কোটি কোটি বিনোদনপ্রেমী পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছেন এই কালজয়ী হাসির রাজপুত্রকে, যিনি তার বহুমুখী প্রতিভা ও কাজের মধ্য দিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।