Monday 10 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

আন্তোনিও বানদেরাস: স্প্যানিশ হৃদস্পন্দন থেকে বিশ্বমঞ্চের নায়ক

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১০ আগস্ট ২০২৬ ১৬:৪৮

১৯৮০-র দশকের শুরুর দিকে মাদ্রিদের এক আন্ডারগ্রাউন্ড থিয়েটারের ড্রেসিংরুমে বসে এক তরুণ অভিনেতা নিজের পোশাক গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। স্পেনের এক শান্ত উপকূলীয় শহর থেকে পকেটে সামান্য কিছু স্বপ্ন নিয়ে আসা সেই তরুণের কাছে তখন ঠিকমতো রাতের খাবার খাওয়ার টাকাও ছিল না। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ে; ভেতরে প্রবেশ করেন উদীয়মান তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালক পেদ্রো আলমোদোভার। তরুণের গভীর, তীক্ষ্ণ চোখ আর সহজাত রোমান্টিক ব্যক্তিত্ব দেখে আলমোদোভার মুহূর্তেই থমকে যান এবং সোজাসুজি বলেন, ‘তোমার মুখটা ভীষণ সিনেম্যাটিক, তোমার একদিন রোমান্টিক নায়ক হওয়া উচিত।’ স্প্যানিশ সিনেমার ছকভাঙা সেই ক্ষণটিতেই জন্ম নিয়েছিল এক হবু আন্তর্জাতিক কিংবদন্তির পথচলা যার নাম আন্তোনিও বানদেরাস।

বিজ্ঞাপন

১৯৬০ সালের ১০ আগস্ট স্পেনের মালাগায় জন্ম নেন হোসে আন্তোনিও দোমিঙ্গেস বানদেরাস। বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা শিক্ষিকা। শৈশবে আন্তোনিওর অদম্য ইচ্ছে ছিল পেশাদার ফুটবলার হওয়ার, কিন্তু ১৪ বছর বয়সে পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। ফুটবল মাঠের বিরহ তাকে টেনে আনে নাটকের মঞ্চে। পাসাদেনা বা স্প্যানিশ থিয়েটারের কঠিন মঞ্চে অভিনয়ের শিক্ষা নিয়ে তিনি পেদ্রো আলমোদোভারের ‘লাবিরিন্থ অফ প্যাশন’, ‘উমেন অন দ্য নার্ভাস ব্রেকডাউন’, এবং ‘টাই মি আপ! টাই মি ডাউন!’ ছবির মাধ্যমে স্প্যানিশ চলচ্চিত্রে এক বিশাল ঝড় তোলেন। তার অভিনয়ের অনায়াস সাবলীলতা এবং তীব্র আবেগ খুব দ্রুতই আন্তর্জাতিক সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে একবিন্দু ইংরেজি না জেনে কেবল কান দিয়ে শুনে শব্দ মুখস্থ করে হলিউডে পাড়ি জমান তিনি। ১৯৯২ সালে ‘দ্য মাম্বো কিংস’ দিয়ে যাত্রা শুরু করে ১৯৯৩ সালে ‘ফিলাডেলফিয়া’ ছবিতে টম হ্যাঙ্কসের বিপরীতে তার অভিনয় বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়। এরপর ‘ইন্টারভিউ উইথ দ্য ভ্যাম্পায়ার’ এবং ‘ডেসপারেডো’ ছবিতে তরবারি ও বন্দুক হাতে সেই চিরচেনা ক্যারিশম্যাটিক রূপ তাকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় অ্যাকশন ও রোমান্টিক প্রতীকে পরিণত করে। ১৯৯৮ সালের ‘দ্য মাঙ্ক অফ জোরো’ ছবিতে মুখোশধারী নায়ক জোরো চরিত্রে তার তলোয়ার চালনা আর চোখের আবেদন আজও পপ কালচারের এক অনন্য ইতিহাস।

কেবল রূপালী পর্দার নায়ক হিসেবেই নয়, কণ্ঠশিল্পী এবং পরিচালক হিসেবেও তিনি নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন। ‘এভিতা’ মিউজিক্যালে তার গান কিংবা অ্যানিমেটেড ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘শ্রেক’ ও ‘পুস ইন বুটস’-এর সেই বিখ্যাত বিড়াল চরিত্র ‘পুস’-এর কণ্ঠে তার স্প্যানিশ টান বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের হৃদয় জয় করে নেয়। পেশাদার জীবনের চূড়ায় থাকা অবস্থাতেও তিনি শিল্পকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন—যার প্রমাণ মেলে ২০১৯ সালে আলমোদোভারের ‘পেইন অ্যান্ড গ্লোরি’ ছবিতে তার জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয়ে, যা তাকে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার পুরস্কার এনে দেয় এবং ক্যারিয়ারে প্রথম অস্কার মনোনয়ন পাইয়ে দেয়।

ক্যারিয়ার জুড়ে হৃৎপিণ্ডের অসুস্থতা আর ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঝড়-ঝাপটা পার করেও বানদেরাসের চোখের সেই আগুন কখনো নেভেনি। যে স্প্যানিশ তরুণের ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে একসময় হলিউড সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, সেই মানুষটিই নিজের সংস্কৃতি, আত্মবিশ্বাস আর অসাধারণ অভিনয়শৈলী দিয়ে বিশ্ব সিনেমার হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। আলো ঝলমলে রূপালী পর্দা পেরিয়ে আন্তোনিও বানদেরাস আজও তাই এক অপরাজেয় শিল্পীর প্রতীক যিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের আবেগ কোনো ভৌগোলিক বা ভাষার সীমানায় আটকে থাকে না।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি