Wednesday 22 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মহাবিপদের রক্ষাকবচ ‘দোয়া ইউনুস’

সারাবাংলা ডেস্ক
২২ জুলাই ২০২৬ ২০:১৯

মানবজীবন কখনই সবসময় মসৃণ চলে না। কখনো কখনো এমন কঠিন ঝড় বা অন্ধকার আমাদের গ্রাস করতে আসে, যখন চারপাশের চেনা পৃথিবীটাও একদম অচেনা আর নিঃসঙ্গ মনে হয়। সংকটের সেই চরম মুহূর্তে আমরা অনেকেই হতাশ হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ি। কিন্তু বিশ্বাসী মুমিনের অভিধানে ‘হতাশা’ বলে কোনো শব্দ নেই। কারণ, যেখানে মানুষের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, সেখান থেকেই মহান আল্লাহর কুদরতের পথ উন্মুক্ত হয়।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অভয় দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা আমার কাছে দোয়া করো, আমি তোমাদের দোয়া কবুল করব।’ (সুরা মুমিন: আয়াত ৬০)। আর এই দোয়ার জগতে মহাবিপদ থেকে মুক্তির সবচেয়ে পরীক্ষিত এবং অলৌকিক এক হাতিয়ারের নাম ‘দোয়া ইউনুস’। সাগরের তলদেশে মাছের পেটের সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকার থেকে আল্লাহর এক পয়গম্বরকে যে দোয়া মুক্ত করেছিল, তা আজও যেকোনো জ্যামিতিক হিসাব ছাড়াই মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আসুন জেনে নেই, এই দোয়ার ফজিলত ও আমলের সঠিক নিয়ম…

দোয়া ইউনুস-এর ঐতিহাসিক পটভূমি

আল্লাহর পয়গম্বর হযরত ইউনুস (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশ আসার আগেই নিজ সম্প্রদায়কে ছেড়ে চলে যান, তখন একপর্যায়ে তিনি গভীর সমুদ্রে বিশাল এক মাছের পেটে বন্দি হন। অন্ধকার ও দমবন্ধ সেই মহাবিপদের মুহূর্তে তিনি সাগরের তলদেশে বসে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে এক অনন্য দোয়া পড়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর সেই আন্তরিক তাওবা কবুল করে অলৌকিকভাবে তাকে মুক্ত করেন। কুরআনে বর্ণিত সেই দোয়াটিই মুসলিম উম্মাহর কাছে ‘দোয়া ইউনুস’ নামে পরিচিত।

আরবি উচ্চারণ ও বাংলা অনুবাদ

আরবি: لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালিমিন।

অর্থ: ‘তুমি ব্যতীত সত্য কোনো উপাস্য নেই; তুমি পুত-পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের (অপরাধীদের) অন্তর্ভুক্ত।’

দোয়া ইউনুস পাঠের ৫টি বিশেষ ফজিলত

আন্তরিকতা ও দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এই দোয়াটি পাঠ করলে আল্লাহর রহমতে নিম্নলিখিত কল্যাণগুলো লাভ করা যায়:

কঠিন সংকট থেকে মুক্তি: যেকোনো বড় বিপদ-আপদ, জুলুম বা ফেতনা থেকে দ্রুত উদ্ধার পাওয়ার পথ সুগম হয়।

মানসিক প্রশান্তি লাভ: মন থেকে সব ধরনের দুশ্চিন্তা, হতাশা, ডিপ্রেশন, ভয় এবং মানসিক অস্থিরতা দূর হয়ে যায়।

ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি: এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর একত্ববাদ ও পবিত্রতা স্বীকার করা হয়, যা বান্দার ঈমান ও তাওয়াক্কুলকে (আল্লাহর ওপর ভরসা) আরও মজবুত করে।

তাওবার অভ্যাস গড়ে ওঠা: নিজের ভুল ও পাপের কথা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার এক অনন্য মানসিকতা তৈরি হয়।

দোয়া দ্রুত কবুল হওয়া: হাদিস অনুযায়ী, এই দোয়ার উসিলায় আল্লাহর বিশেষ রহমত ও সাহায্য লাভ করা অনেক সহজ হয়।

দোয়া ইউনুস পড়ার সঠিক নিয়ম ও আদব

অনেকে মনে করেন এটি কেবল একটি জিকির। তবে ইসলামি স্কলারদের মতে, এটি এমন এক জিকির যা দিয়ে মূলত দোয়া শুরু করা হয়। এই আমলটির পূর্ণ বরকত পেতে কিছু জরুরি নিয়ম মেনে চলা উচিত…

১. উপার্জন হালাল রাখা: দোয়া কবুলের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো খাদ্য, পানীয় এবং জীবনযাত্রার সামগ্রিক উপার্জন শতভাগ হালাল হওয়া।
২. প্রশংসা ও দরুদ শরিফ: দোয়ার শুরুতে আল্লাহর গুণগান করা এবং নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা উত্তম। দোয়া শেষেও দরুদ পড়া ভালো।
৩. একাগ্রতা ও বিনয়: পূর্ণ মনোযোগ, ভয়ভীতি এবং সম্ভব হলে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে আল্লাহর কাছে নিজের আকুতি তুলে ধরা।
৪. দৃঢ় বিশ্বাস রাখা: ‘আল্লাহ আমার দোয়া অবশ্যই শুনছেন এবং কবুল করবেন’—অন্তরে এমন দৃঢ় আস্থা বজায় রাখা।
৫. ধৈর্য ধরা: দোয়া কবুলের জন্য অধৈর্য বা তাড়াহুড়ো না করা এবং বিরক্ত না হয়ে বারবার চাইতে থাকা।

‘খতমে ইউনুস’ নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে যে, কোনো বড় বিপদে পড়লে নির্দিষ্ট সংখ্যা মেপে (যেমন ১ লাখ ২৫ হাজার বার) ‘খতমে ইউনুস’ পড়াতে হবে। তবে জেনে রাখা ভালো, ইসলামি শরিয়তে এই দোয়া পাঠের জন্য এমন কোনো সুনির্দিষ্ট সময়, দিন বা সংখ্যার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়নি।

এভাবে সংখ্যা গুনে খতমের আয়োজন করার পক্ষে কোনো স্পষ্ট শরিয়ি দলিল বা সহিহ হাদিসের ভিত্তি নেই। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো, বিপদগ্রস্ত বান্দা নিজেই নিজের হৃদয়ের সমস্ত আকুতি ও কান্না নিয়ে আল্লাহর দরবারে এই দোয়াটি বারবার পড়বে, যেন আল্লাহ তার আন্তরিকতায় সন্তুষ্ট হয়ে মোনাজাত কবুল করেন।

শেষ কথা: দোয়া ইউনুস কেবল মাছের পেট থেকে হযরত ইউনুস (আ.)-এর মুক্ত হওয়ার কোনো ঐতিহাসিক গল্প নয়; বরং এটি কিয়ামত পর্যন্ত আসা প্রতিটি ভাঙা মনের মানুষের জন্য এক মহাজাগতিক আশার আলো। যখনই জীবনের কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে একাকী বা অসহায় মনে হবে, তখনই অজুর সাথে জায়নামাজে বসে যান। লোকদেখানো খতমের কৃত্রিম আয়োজন কিংবা হুজুরদের সংখ্যার হিসাব বাদ দিয়ে, নিজের হৃদয়ের সমস্ত কান্না আর আকুতি মিশিয়ে আল্লাহর দরবারে এই দোয়ার মাধ্যমে তাওবা করুন।

যিনি সাগরের অতল গভীরে অন্ধকারের ভেতর মাছের পেটে থাকা বান্দার ফরিয়াদ শুনেছিলেন, তিনি আপনার ঘরের কোণে বসে করা অশ্রুসজল মোনাজাতও ফিরিয়ে দেবেন না। মহান আল্লাহ আমাদের জীবনের সব কঠিন পেরেশানি দূর করে দিন এবং সর্বদা সুন্নাহর আলোয় পথ চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

সারাবাংলা/এনএল/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর